রৌমারী-রাজিবপুরে সড়ক সংযোগের অভাবে এখনও নদীই একমাত্র ভরসা
- আপডেট সময় : ১১:৫৪:১৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬ ৯২ বার পড়া হয়েছে
উত্তরের সীমান্ত জেলা কুড়িগ্রামের দুই নদীবেষ্টিত উপজেলা রৌমারী ও রাজিবপুরে পৌঁছানো এখনও এক কঠিন বাস্তবতার নাম। জেলা সদর থেকে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ না থাকায় ব্রহ্মপুত্র নদ পাড়ি দিয়েই সেখানে যেতে হয়। বছরের অধিকাংশ সময়, বিশেষ করে বর্ষাকালে, উত্তাল নদী, তীব্র স্রোত ও বৈরী আবহাওয়ার মধ্যে স্পিডবোটই হয়ে ওঠে সরকারি কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি এবং সাধারণ মানুষের একমাত্র ভরসা।
এমন বাস্তবতার মধ্যেই চলমান সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের অগ্রগতি সরেজমিনে দেখতে নদীপথে রৌমারী ও রাজিবপুর সফর করেছেন স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) কুড়িগ্রাম জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী। উন্নয়ন কার্যক্রমের মান নিশ্চিত করতে জীবনঝুঁকি নিয়েই তিনি নদীপথে দীর্ঘ যাত্রা করেন।
সফরের শুরুতে স্পিডবোটে নদী অতিক্রমের একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করে তিনি লিখেন, “মনে হচ্ছে আটলান্টিক পাড়ি দিচ্ছি। দোয়া করবেন। গন্তব্য রৌমারী-রাজিবপুর।” তাঁর এই মন্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয় এবং সীমান্ত অঞ্চলে সরকারি দায়িত্ব পালনের কঠিন বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে আসে।
দুই থেকে আড়াই ঘণ্টার নদীপথই একমাত্র যোগাযোগ
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, জেলা সদর থেকে রৌমারী ও রাজিবপুরে যেতে নদীপথে স্পিডবোটে সাধারণত দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা সময় লাগে। নদীর পানি বৃদ্ধি বা প্রতিকূল আবহাওয়া থাকলে এই সময় আরও বেড়ে যায়। অনেক সময় যাত্রীদের নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যেই যাতায়াত করতে হয়।
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, শিক্ষক, চিকিৎসক, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী, কৃষক এবং সাধারণ মানুষ—সবার জন্যই নদীপথই প্রধান যোগাযোগ ব্যবস্থা। জরুরি চিকিৎসা, প্রশাসনিক কাজ কিংবা উন্নয়ন প্রকল্প তদারকি—সব ক্ষেত্রেই এই নদীপথের ওপর নির্ভর করতে হয়।
প্রকল্পের গুণগত মান নিশ্চিত করতে মাঠে নির্বাহী প্রকৌশলী
এলজিইডি সূত্রে জানা যায়, সফরকালে নির্বাহী প্রকৌশলী রৌমারী ও রাজিবপুর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় বাস্তবায়নাধীন গ্রামীণ সড়ক, সেতু, কালভার্ট, বাজার সংযোগ সড়ক এবং অন্যান্য অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প পরিদর্শন করছেন। তিনি প্রকল্পের কাজ নির্ধারিত নকশা অনুযায়ী হচ্ছে কি না, নির্মাণসামগ্রীর মান, কাজের অগ্রগতি এবং সময়সূচি সরেজমিনে যাচাই করবেন।
সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি জানান, উন্নয়ন প্রকল্পের গুণগত মান নিশ্চিত করতে নিয়মিত মাঠপর্যায়ে উপস্থিত থাকা জরুরি। প্রকল্প বাস্তবায়নে কোনো ধরনের অনিয়ম বা নিম্নমানের কাজ যাতে না হয়, সে বিষয়েও কঠোর নজরদারি অব্যাহত থাকবে।
তিনি বলেন, “সরকার আমাকে যে দায়িত্ব দিয়েছে, তা সততা, নিষ্ঠা ও স্বচ্ছতার সঙ্গে পালনের চেষ্টা করছি। জনগণের অর্থে বাস্তবায়িত প্রতিটি প্রকল্পের মান নিশ্চিত করতে নিয়মিত মাঠপর্যায়ে যাচ্ছি। যতই কষ্ট বা ঝুঁকি থাকুক, উন্নয়নের কাজ সরেজমিনে পরিদর্শন করতেই হবে।”
অবহেলিত সীমান্ত অঞ্চলে আরও উন্নয়নের দাবি
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, রৌমারী ও রাজিবপুর দীর্ঘদিন ধরেই যোগাযোগব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে উন্নয়নের দিক থেকে পিছিয়ে রয়েছে। কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণ, শিক্ষার্থীদের যাতায়াত, স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে প্রতিনিয়ত ভোগান্তির শিকার হতে হয়।
তাদের দাবি, এই দুই উপজেলায় আরও বেশি সড়ক, সেতু, কালভার্ট এবং টেকসই যোগাযোগ অবকাঠামো নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। উন্নয়ন প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়িত হলে সীমান্ত অঞ্চলের মানুষের জীবনমানের উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটবে।
নিয়মিত তদারকিতে বাড়বে স্বচ্ছতা
উন্নয়ন সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু প্রকল্প অনুমোদন বা অর্থ বরাদ্দ দিলেই কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন নিশ্চিত হয় না। মাঠপর্যায়ে নিয়মিত পরিদর্শন, কাজের মান যাচাই, জনগণের মতামত গ্রহণ এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার মাধ্যমেই প্রকল্পের সফল বাস্তবায়ন সম্ভব।
দুর্গম এলাকায় সরকারি কর্মকর্তাদের সরাসরি উপস্থিতি প্রকল্প বাস্তবায়নে গতি আনার পাশাপাশি জনগণের আস্থা বাড়ায় এবং অনিয়মের সুযোগ কমিয়ে আনে।
সীমান্ত অঞ্চলের মানুষের প্রত্যাশা
রৌমারী ও রাজিবপুরের বাসিন্দারা মনে করেন, চলমান উন্নয়ন প্রকল্পগুলো নির্ধারিত সময়ে ও গুণগত মান বজায় রেখে সম্পন্ন হলে যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতি ঘটবে, জনদুর্ভোগ কমবে এবং সীমান্ত অঞ্চলের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে। একই সঙ্গে সরকারি কর্মকর্তাদের নিয়মিত মাঠপর্যায়ে উপস্থিতি উন্নয়ন কার্যক্রমে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও জনবিশ্বাস আরও শক্তিশালী করবে বলেও তাদের প্রত্যাশা।










