ঢাকা ০৬:৫৬ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
নেশার টাকা চেয়ে বাবা-মাকে মারধরে ছেলের বিরুদ্ধে মামলা কাহারোলে তথ্য চাওয়ায় দুই সাংবাদিককে অবরুদ্ধ, ইউএনও’র হস্তক্ষেপে উদ্ধার লালপুরে পুলিশ সদস্যসহ ইয়াবা নিয়ে গ্রেপ্তার ৩ ঈশ্বরদীতে আওয়ামী লীগের ‘গুপ্ত মিছিলের’ প্রতিবাদে বিএনপির বিক্ষোভ মিছিল জাকারিয়া পিন্টু ও সহযোগীদের গ্রেপ্তারের দাবিতে পাবনায় মানববন্ধন রাষ্ট্রপতির সঙ্গে রুয়েট উপাচার্যের সৌজন্য সাক্ষাৎ, ষষ্ঠ সমাবর্তন জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে পাবনায় ইয়াবাসহ দুই কারবারি আটক, কারাদণ্ড ৩ মাদকসেবীর সত্যের পক্ষে এক সাহসিক কলম যোদ্ধা : সায়েক এম রহমান  বাংলাদেশ প্রেসক্লাব পাবনা জেলা শাখার মিলন মেলা ও পরিচিতি সভা অনুষ্ঠিত ফরিদপুরে কৃষকদের আস্থার প্রতিক উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আল ইমরান

সুপরিচিত ও জনপ্রিয় কবি-সাহিত্যিক মাধুরী ব্যানার্জীর লেখা অণুগল্প : ” ছায়ার আলপনা “

ছায়ার আলপনা, মাধুরী ব্যানার্জী
  • আপডেট সময় : ১২:০৮:৩৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৭ অগাস্ট ২০২৬ ৪৯ বার পড়া হয়েছে

বর্ষার শেষ বিকেল। গ্রামের শেষ প্রান্তে একটি পুরোনো বাড়ি—মাটির দেওয়াল, খড়ের চাল, আর উঠোন জুড়ে একটি বিশাল শিউলি গাছ। বাড়িটিতে থাকতেন আশালতা দেবী। বয়সের ভারে শরীর নুয়ে এলেও তাঁর চোখে ছিল এক অদ্ভুত শান্তির দীপ্তি।

প্রতিদিন সন্ধ্যায় তিনি উঠোনে চালের গুঁড়ো দিয়ে আলপনা আঁকতেন। আশ্চর্যের বিষয়, ভোরে দেখা যেত আলপনার পাশে আরও কিছু নকশা ফুটে উঠেছে—যেন কারও অদৃশ্য হাত রাতের আঁধারে তাকে পূর্ণতা দিয়েছে।
গ্রামের লোকেরা বলত, “এ বাড়িতে নিশ্চয়ই অলৌকিক কিছু আছে।”
কিন্তু আশালতা দেবী শুধু হেসে বলতেন, “যেখানে ভালোবাসা থাকে, সেখানে ছায়াও কথা বলতে শেখে।”
এই রহস্যের টানেই শহর থেকে এল চারুকলার ছাত্রী ময়ূরী। সে লোককলা নিয়ে গবেষণা করছিল। কয়েকদিন বাড়িটিতে থেকে সে লক্ষ্য করল, আশালতা দেবী প্রতিটি আলপনা আঁকার আগে চোখ বন্ধ করে কারও উদ্দেশ্যে প্রার্থনা করেন।
একদিন সাহস করে ময়ূরী জিজ্ঞেস করল, —“ঠাকুমা, আপনি কার সঙ্গে কথা বলেন?”
আশালতা দেবী মৃদু হেসে বললেন, —“যে মানুষগুলো চলে যায়, তারা কি সত্যিই হারিয়ে যায়? স্মৃতির ভেতর তারা ছায়া হয়ে থেকে যায়। আমি তাদেরই ডাকি।”
সেদিন রাতে ময়ূরীর ঘুম এল না। জানালার ফাঁক দিয়ে চাঁদের আলো উঠোনে পড়েছে। হাওয়ায় শিউলি ফুল ঝরে পড়ছে। হঠাৎ সে দেখল, গাছের ছায়া ধীরে ধীরে আলপনার উপর নেচে উঠছে। বাতাসের দোলায় সেই ছায়াগুলো এমন সুন্দর নকশা তৈরি করল, যেন প্রকৃতিই নিজের হাতে আঁকছে এক অনন্য শিল্পকর্ম।
ভোরে ময়ূরী বুঝল রহস্যের আসল মানে। অলৌকিক কিছু নয়—চাঁদের আলো, গাছের ডাল, ঝরে পড়া ফুল আর মানুষের গভীর স্মৃতি মিলে সৃষ্টি করে সেই বিস্ময়। কিন্তু আশ্চর্য ছিল, সেই নকশাগুলো ঠিক আশালতা দেবীর অসমাপ্ত রেখাগুলোকেই সম্পূর্ণ করত।
কয়েক মাস পরে আশালতা দেবী পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন।
পরের শরতে ময়ূরী আবার সেই বাড়িতে ফিরে এল। উঠোন ফাঁকা, বাড়ি নিস্তব্ধ। তবু সে আগের মতোই চালের গুঁড়ো দিয়ে একটি ছোট্ট আলপনা আঁকল।
রাত কেটে গেল।
ভোরের আলো ফুটতেই সে বিস্ময়ে থমকে দাঁড়াল। আলপনার চারপাশে শিউলি ফুল ঝরে এমন এক অপূর্ব নকশা তৈরি হয়েছে, যা কোনো মানুষের হাতে সম্ভব নয়। বাতাস যেন নীরবে বলল—
“যে ভালোবাসা হৃদয়ে আঁকা থাকে, তাকে সময় মুছে দিতে পারে না।”
ময়ূরী সেদিন বুঝেছিল, ছায়া কখনও অন্ধকারের প্রতীক নয়। কখনও কখনও ছায়াই স্মৃতির সবচেয়ে উজ্জ্বল রং।
সেই থেকে প্রতি শরতে গ্রামের মানুষ সেই উঠোনে আলপনা আঁকে। তারা বিশ্বাস করে, মানুষের জীবন একদিন শেষ হলেও তার স্নেহ, মমতা আর ভালোবাসা ছায়ার মতো পৃথিবীতে থেকে যায়—নিঃশব্দে, অথচ গভীরভাবে।
আর সেই অদৃশ্য ভালোবাসার রেখাগুলোর নামই—ছায়ার আলপনা।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :

সুপরিচিত ও জনপ্রিয় কবি-সাহিত্যিক মাধুরী ব্যানার্জীর লেখা অণুগল্প : ” ছায়ার আলপনা “

আপডেট সময় : ১২:০৮:৩৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৭ অগাস্ট ২০২৬

বর্ষার শেষ বিকেল। গ্রামের শেষ প্রান্তে একটি পুরোনো বাড়ি—মাটির দেওয়াল, খড়ের চাল, আর উঠোন জুড়ে একটি বিশাল শিউলি গাছ। বাড়িটিতে থাকতেন আশালতা দেবী। বয়সের ভারে শরীর নুয়ে এলেও তাঁর চোখে ছিল এক অদ্ভুত শান্তির দীপ্তি।

প্রতিদিন সন্ধ্যায় তিনি উঠোনে চালের গুঁড়ো দিয়ে আলপনা আঁকতেন। আশ্চর্যের বিষয়, ভোরে দেখা যেত আলপনার পাশে আরও কিছু নকশা ফুটে উঠেছে—যেন কারও অদৃশ্য হাত রাতের আঁধারে তাকে পূর্ণতা দিয়েছে।
গ্রামের লোকেরা বলত, “এ বাড়িতে নিশ্চয়ই অলৌকিক কিছু আছে।”
কিন্তু আশালতা দেবী শুধু হেসে বলতেন, “যেখানে ভালোবাসা থাকে, সেখানে ছায়াও কথা বলতে শেখে।”
এই রহস্যের টানেই শহর থেকে এল চারুকলার ছাত্রী ময়ূরী। সে লোককলা নিয়ে গবেষণা করছিল। কয়েকদিন বাড়িটিতে থেকে সে লক্ষ্য করল, আশালতা দেবী প্রতিটি আলপনা আঁকার আগে চোখ বন্ধ করে কারও উদ্দেশ্যে প্রার্থনা করেন।
একদিন সাহস করে ময়ূরী জিজ্ঞেস করল, —“ঠাকুমা, আপনি কার সঙ্গে কথা বলেন?”
আশালতা দেবী মৃদু হেসে বললেন, —“যে মানুষগুলো চলে যায়, তারা কি সত্যিই হারিয়ে যায়? স্মৃতির ভেতর তারা ছায়া হয়ে থেকে যায়। আমি তাদেরই ডাকি।”
সেদিন রাতে ময়ূরীর ঘুম এল না। জানালার ফাঁক দিয়ে চাঁদের আলো উঠোনে পড়েছে। হাওয়ায় শিউলি ফুল ঝরে পড়ছে। হঠাৎ সে দেখল, গাছের ছায়া ধীরে ধীরে আলপনার উপর নেচে উঠছে। বাতাসের দোলায় সেই ছায়াগুলো এমন সুন্দর নকশা তৈরি করল, যেন প্রকৃতিই নিজের হাতে আঁকছে এক অনন্য শিল্পকর্ম।
ভোরে ময়ূরী বুঝল রহস্যের আসল মানে। অলৌকিক কিছু নয়—চাঁদের আলো, গাছের ডাল, ঝরে পড়া ফুল আর মানুষের গভীর স্মৃতি মিলে সৃষ্টি করে সেই বিস্ময়। কিন্তু আশ্চর্য ছিল, সেই নকশাগুলো ঠিক আশালতা দেবীর অসমাপ্ত রেখাগুলোকেই সম্পূর্ণ করত।
কয়েক মাস পরে আশালতা দেবী পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন।
পরের শরতে ময়ূরী আবার সেই বাড়িতে ফিরে এল। উঠোন ফাঁকা, বাড়ি নিস্তব্ধ। তবু সে আগের মতোই চালের গুঁড়ো দিয়ে একটি ছোট্ট আলপনা আঁকল।
রাত কেটে গেল।
ভোরের আলো ফুটতেই সে বিস্ময়ে থমকে দাঁড়াল। আলপনার চারপাশে শিউলি ফুল ঝরে এমন এক অপূর্ব নকশা তৈরি হয়েছে, যা কোনো মানুষের হাতে সম্ভব নয়। বাতাস যেন নীরবে বলল—
“যে ভালোবাসা হৃদয়ে আঁকা থাকে, তাকে সময় মুছে দিতে পারে না।”
ময়ূরী সেদিন বুঝেছিল, ছায়া কখনও অন্ধকারের প্রতীক নয়। কখনও কখনও ছায়াই স্মৃতির সবচেয়ে উজ্জ্বল রং।
সেই থেকে প্রতি শরতে গ্রামের মানুষ সেই উঠোনে আলপনা আঁকে। তারা বিশ্বাস করে, মানুষের জীবন একদিন শেষ হলেও তার স্নেহ, মমতা আর ভালোবাসা ছায়ার মতো পৃথিবীতে থেকে যায়—নিঃশব্দে, অথচ গভীরভাবে।
আর সেই অদৃশ্য ভালোবাসার রেখাগুলোর নামই—ছায়ার আলপনা।