সরকারি চাকরিতে কোটিপতি প্রকৌশলী ! এলজিইডির বাচ্চু মিয়ার বিরুদ্ধে বিস্ফোরক অভিযোগ
- আপডেট সময় : ০৫:৫৩:৪৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ অক্টোবর ২০২৫ ১৬৯ বার পড়া হয়েছে
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)–এর ঢাকা জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. বাচ্চু মিয়ার বিরুদ্ধে ঘুষ, দুর্নীতি, সরকারি অর্থ আত্মসাৎ ও কর ফাঁকির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। ইতোমধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)–এর কাছে একাধিক লিখিত অভিযোগ জমা পড়েছে, যেখানে দাবি করা হয়েছে নিরপেক্ষ তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির।
অভিযোগের বিস্তার ও প্রভাব
বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন ও দুদকে পাঠানো লিখিত অভিযোগে বলা হয়েছে বাচ্চু মিয়ার নামে ও বেনামে একাধিক ফ্ল্যাট, বাড়ি, জমি এবং বিলাসবহুল গাড়ি রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, যদি নিরপেক্ষ তদন্ত হয়, তাহলে আরও উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততাও প্রকাশ পেতে পারে।
২০২৫ সালের ৩০ জুলাই একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে এনবিআরের তদন্তে দেখা যায়, বাচ্চু মিয়াসহ ৩০০ প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে আয়ের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ সম্পদ অর্জনের প্রমাণ পাওয়া গেছে। পরবর্তীতে, একই বছরের ৬ আগস্ট মোহাম্মদ খাজা মহিউদ্দিন নামে একজন নাগরিক দুদক চেয়ারম্যানের কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ জমা দেন।
এর আগেও, ২০২৪ সালের ১৭ অক্টোবর স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে মো. শিকদার হোসেন নামে আরেক ব্যক্তি অভিযোগ দাখিল করেছিলেন। তাতে উল্লেখ করা হয় বাচ্চু মিয়া বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদ-এর পরিচয় ব্যবহার করে সরকারি কাজ ও প্রকল্পে প্রভাব বিস্তার করেছেন এবং রাজনৈতিক যোগাযোগ কাজে লাগিয়ে টেন্ডার, নিয়োগ ও প্রকল্প অনুমোদনে অবৈধ সুবিধা নিয়েছেন। অভিযোগ অনুযায়ী, কেরানীগঞ্জের বিভিন্ন সড়ক, ব্রিজ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রকল্পে কাজ না করেও কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন।
রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাবের ছায়া
২০২৫ সালের ৯ এপ্রিল দৈনিক সংবাদ সারাবেলা-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, নেত্রকোনায় কর্মরত অবস্থায় বাচ্চু মিয়া এক মন্ত্রীর কণ্ঠস্বর নকল করে বিভিন্ন দপ্তরে তদবির চালান। এ ঘটনায় বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল তার বিরুদ্ধে। বর্তমানে তিনি রাজনৈতিক পরিচয় পাল্টে নিজেকে বিএনপির কর্মী বলে দাবি করছেন।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, নিষিদ্ধ ঘোষিত কয়েকজন সাবেক আওয়ামী লীগ নেতার সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে, এমনকি গাজীপুরের সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আলমকেও তিনি আর্থিকভাবে সহায়তা করেছেন। রাজনৈতিক পরিচয়ের বলয়ে থেকে তিনি দীর্ঘদিন ধরে এলজিইডিতে অস্বচ্ছ প্রভাব বিস্তার করে আসছেন, যা প্রশাসনিক নীতির পরিপন্থী।
অবৈধ সম্পদ ও পরিবারিক সম্পৃক্ততা
অভিযোগপত্রে বাচ্চু মিয়া ও তার পরিবারের নামে বিপুল পরিমাণ সম্পদের উল্লেখ রয়েছে। এর মধ্যে উত্তরা সেক্টর–১১–এ স্ত্রী আসমা পারভীনের নামে কোটি টাকার ফ্ল্যাট, গাজীপুরের নিশাদনগর ও জয়দেবপুরে দুটি বাড়ি, পূর্বাচল আবাসিক এলাকায় একটি প্লট।
২০২২ সালে আসমা পারভীনের নামে নিবন্ধিত ঢাকা মেট্রো–গ–৩৫–২৯৫২ নম্বরের একটি গাড়ির ঘোষিত মূল্য বাস্তব মূল্যের তুলনায় অনেক কম বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া পরিবারের সদস্যদের নামে একাধিক বেনামি গাড়ি এবং ব্যাংক অ্যাকাউন্টে কোটি কোটি টাকা জমার কথাও রয়েছে।
সহযোগী দুর্নীতির নেটওয়ার্ক
বাচ্চু মিয়ার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত এলজিইডির উচ্চমান সহকারী নজরুল ইসলাম চাকরির মেয়াদ শেষ হলেও অবৈধভাবে কর্মরত আছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। নজরুল ইসলাম টেন্ডার কারসাজি ও লাইসেন্স সংক্রান্ত দুর্নীতিতে বাচ্চু মিয়াকে সহায়তা করছেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে।
এছাড়া জানা গেছে, যুব ও ক্রীড়া এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়ার সাবেক সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) মোয়াজ্জেম হোসেনকে কোটি টাকার বিনিময়ে বাচ্চু মিয়া তার অনিয়মগুলো দীর্ঘদিন ধরে ধামাচাপা দিয়েছেন।
দুদকের অবস্থান
দুদকের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে গণমাধ্যমকে বলেন, আমরা লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। প্রাথমিক যাচাই-বাছাই চলছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু বলা যাবে না।
পেশাগত স্বচ্ছতা প্রশ্নবিদ্ধ
দেশের অন্যতম বৃহৎ উন্নয়ন সংস্থা হিসেবে এলজিইডির বার্ষিক বাজেট কয়েক হাজার কোটি টাকা। গত এক দশকে এ প্রতিষ্ঠানের প্রকৌশলীদের বিরুদ্ধে টেন্ডার কারসাজি, কমিশন বাণিজ্য, এবং প্রকল্প অনুমোদনে দুর্নীতির অভিযোগ বহুবার উঠেছে। বাচ্চু মিয়ার বিরুদ্ধে নতুন এই অভিযোগ সেই ধারাবাহিকতারই আরেকটি উদাহরণ।
জনমনে প্রশ্ন এখন একটাই দুদক কি সত্যিই নিরপেক্ষভাবে এই অভিযোগের তদন্ত করবে, নাকি এটি সময়ের সঙ্গে আরেকটি আড়ালে চলে যাওয়া কেসে পরিণত হবে? সরকারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার মানদণ্ডে এই ঘটনাটি এখন গণমাধ্যম ও সচেতন নাগরিকদের ঘনিষ্ঠ নজরেই রয়েছে।










