পোরশা থানা: ইতিহাস, ঐতিহ্য ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় নতুন অধ্যায়
- আপডেট সময় : ০৬:৪৯:০০ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২৬ ৭৯ বার পড়া হয়েছে
নওগাঁ জেলার সীমান্তবর্তী পোরশা থানা ১৯৩৩ সালে ব্রিটিশ শাসনামলে প্রতিষ্ঠিত হয়। ঐতিহাসিকভাবে এ অঞ্চল ১৭৯৩ সালে অবিভক্ত দিনাজপুর জেলার অন্তর্ভুক্ত ছিল। পরবর্তীতে ১৪ আগস্ট ১৯৪৭ পর্যন্ত এটি ভারতের মালদহ জেলার নবাবগঞ্জ মহকুমার অধীনে ছিল। দেশভাগের পর এলাকা চাঁপাইনবাবগঞ্জ মহকুমার অন্তর্ভুক্ত হয় এবং ১ মার্চ ১৯৮৪ সালে নওগাঁ জেলা গঠনের পর পোরশা থানাকে নওগাঁ জেলার অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এর আগে ১৯৮৩ সালে পোরশা থানাকে কেন্দ্র করে পোরশা উপজেলা গঠিত হয়। (তথ্যসূত্র: বাংলাপিডিয়া ও বিভিন্ন উন্মুক্ত সূত্র)
জনশ্রুতি রয়েছে, কয়েক শত বছর আগে কিছু পারস্য জনগোষ্ঠী জীবিকার সন্ধানে এ অঞ্চলে এসে বর্তমান উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৫ কিলোমিটার দূরের পোরশা গ্রামে বসতি স্থাপন করেন। সেই গ্রামের নাম থেকেই পরবর্তীতে থানার নামকরণ হয় পোরশা। বর্তমানে প্রায় ২৭২ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এ থানায় প্রায় দুই লক্ষ মানুষের বসবাস।
বরেন্দ্র অঞ্চলের অংশ হওয়ায় পোরশা দিগন্তবিস্তৃত আমবাগানের জন্য সুপরিচিত। সাপাহার উপজেলার সঙ্গে মিলে এটি দেশের অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্যিক আম উৎপাদনকারী অঞ্চল হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। একসময় সাপাহার থানাও পোরশা থানার অধীন ছিল। বর্তমানে কয়েক হাজার হেক্টর জমিতে আম্রপালি, গৌরমতি, বারি-৪সহ বিভিন্ন জাতের আম চাষ হয়। কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৪ সালের দিকে সীমিত পরিসরে শুরু হওয়া এই বাণিজ্যিক আমচাষ এখন স্থানীয় অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছে, যেখানে প্রতিবছর প্রায় হাজার কোটি টাকার আম বাণিজ্যের সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়।
ব্রিটিশ আমলে নির্মিত মূল থানা ভবনের আর কোনো অস্তিত্ব নেই। তবে সেই সময়ের স্মৃতি বহন করে এখনো দাঁড়িয়ে আছে একটি ঐতিহাসিক পুকুর ও কয়েকটি প্রাচীন বৃক্ষ। যুগের পর যুগ ধরে পোরশা থানা মানুষের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তার প্রতীক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছে। প্রতিষ্ঠার পর থেকে থানার সেবার দরজা কখনোই বন্ধ হয়নি।
সীমান্তবর্তী এলাকা হওয়ায় পোরশা থানায় দীর্ঘদিন ধরে ডাকাতি, চোরাচালান, মাদক এবং ভূমি-সংক্রান্ত অপরাধ ছিল উল্লেখযোগ্য। বিশেষ করে সড়কে গাছ ফেলে ডাকাতির ঘটনায় এলাকাটি একসময় পরিচিত ছিল। পার্শ্ববর্তী চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার গোমস্তাপুরসহ বিভিন্ন এলাকা এবং স্থানীয় কিছু দুর্বৃত্ত সংঘবদ্ধ হয়ে সন্ধ্যা ও রাতের সময় সড়কে গাছ ফেলে ডাকাতির চেষ্টা করত। অপরাধ সংঘটনের পর তারা বিস্তীর্ণ আমবাগানে আত্মগোপন করত। ২০২৬ সালের পূর্ব পর্যন্ত প্রায় প্রতি মাসেই এমন ঘটনার খবর পাওয়া যেত।
পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম দায়িত্ব গ্রহণের পর পোরশা থানায় জেলা পুলিশের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করা হয়। সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পরিকল্পিতভাবে একাধিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়। রাতের বেলায় গুরুত্বপূর্ণ সড়কে একাধিক পুলিশ টহল দল মোতায়েন, প্রয়োজনে স্পেশাল ফোর্স ও রেঞ্জ রিজার্ভ ফোর্সের সদস্যদের দায়িত্ব পালন, সারাইগাছীতে নতুন পুলিশ পোস্ট স্থাপন এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় সোলার লাইট স্থাপন করা হয়েছে।
পুলিশ ও সাধারণ মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় পোরশা থানা এলাকার সড়কগুলো বর্তমানে অনেকটাই অপরাধমুক্ত হয়েছে। জেলা পুলিশের ধারাবাহিক অভিযান এবং পুলিশ সুপারের নিয়মিত তদারকির ফলে ডাকাতিসহ বিভিন্ন অপরাধ উল্লেখযোগ্যভাবে নিয়ন্ত্রণে এসেছে। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির আরও উন্নয়নে বর্তমান জেলা পুলিশ প্রশাসন ভবিষ্যতেও কঠোর অবস্থান বজায় রাখবে। স্থানীয় জনগণের সহযোগিতায় পোরশা থানা পুলিশ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় সর্বাত্মকভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
— মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম
পুলিশ সুপার, নওগাঁ















