ঢাকা ০৬:০৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ২১ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা হাবিবুর রহমান হাবিবের বিরুদ্ধে অপপ্রচারের প্রতিবাদে মানববন্ধন ঈশ্বরদীর পদ্মাপাড়ে সন্ত্রাসের আতঙ্ক, নিরাপত্তার দাবিতে মানববন্ধন বিএনপিকে ক্ষমতাচ্যুত করার ষড়যন্ত্রকারীদের রাজনীতি চিরতরে কবর দেওয়া হবে: হাবিবুর রহমান ঈশ্বরদীতে বসতবাড়ি দখল করে সীমানা প্রাচীর ও গেট নির্মাণ: হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ ঈশ্বরদীতে পোল্ট্রি খামারে বিদ্যুৎ স্পৃষ্টে যুবকের মৃত্যু ঈশ্বরদীতে সড়কের কাজের মান যাচাইয়ে মাঠে এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী সরকারি সফরের নামে স্ত্রী নিয়ে সচিবের ভ্রমণ কুমিল্লায় ১০ কেজি গাঁজাসহ গ্রেপ্তার ২  ঠাকুরগাঁওয়ে হিফজুল কুরআন ও হুসনে সওত প্রতিযোগিতা ও পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠিত ফরিদপুরে দ্বিতীয় শ্রেণীর শিক্ষার্থীকে ধর্ষণ চেষ্টা: সপ্তাহ পেরোলেও ধরাছোঁয়ার বাহিরে আসামি রুবেল

মধ্যযুগীয় বর্বরতার অবসান: মহেশপুরে যমজ কন্যা জন্ম দেওয়ায় তালাকপ্রাপ্তা সেই রিনা ওসির হস্তক্ষেপে ফিরলেন স্বামীর সংসারে

ঝিনাইদহ প্রতিনিধিঃ
  • আপডেট সময় : ০৯:৪৪:২৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬ ১০৬ বার পড়া হয়েছে

একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়েও যমজ কন্যাসন্তান জন্ম দেওয়া যেন হয়েছিল এক মহাপাপ! আর এই ‘অপরাধে’ ঝিনাইদহের মহেশপুরে দেড় মাসের দুটি ফুটফুটে কন্যাসন্তানসহ রিনা খাতুন নামের এক ভাগ্যবিড়ম্বিত গৃহবধূকে তালাক দেওয়ার মতো এক মধ্যযুগীয় ও অমানবিক ঘটনা ঘটেছিল।

তবে সব অন্ধকার ও ভুল বোঝাবুঝির অবসান ঘটিয়ে অবশেষে সেই আলোচিত যমজ কন্যার মা পবিত্র সংসারের টানে আবার স্বামীর ঘরে ফিরেছেন। আজীবন একসাথে থাকার নতুন প্রতিশ্রুতি নিয়েছেন এই দম্পতি। আর এই ভাঙতে যাওয়া সংসারকে জোড়া লাগাতে এবং নিষ্পাপ দুটি শিশুর মুখে হাসি ফোটাতে অনন্য ও মানবিক ভূমিকা পালন করেছে মহেশপুর থানা পুলিশ।

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, প্রায় দুই বছর আগে মহেশপুর উপজেলার কাজিরবের ইউনিয়নের নতুন কোলা গ্রামের শহিদুল ইসলামের ছেলে রাকিবুল ইসলামের সঙ্গে পার্শ্ববর্তী পুরাতন কোলা গ্রামের মৃত পীর বক্সের মেয়ে রিনা খাতুনের পারিবারিকভাবে বিয়ে হয়। বিয়ের পর প্রথম দিনগুলো সুখের হলেও বিপত্তি ঘটে রিনা অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার পর। গর্ভধারণের ছয় মাস পর আল্ট্রাসনোগ্রাফি রিপোর্টে যখন জানা যায় গর্ভের সন্তান দুটিই ‘কন্যা’, ঠিক তখন থেকেই রিনার ওপর নেমে আসে অন্ধকার।

স্বামী রাকিবুল ও তার পরিবারের সদস্যরা কন্যাসন্তানের খবর মেনে নিতে না পেরে রিনার ওপর তীব্র মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন শুরু করে। একপর্যায়ে বাধ্য হয়ে বাবার বাড়িতে আশ্রয় নেন রিনা এবং সেখানেই অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে দুটি ফুটফুটে কন্যাসন্তানের জন্ম দেন।

শিশুদের বয়স দেড় মাস পার হয়ে গেলেও পাষণ্ড পিতা বা তার পরিবারের কেউ সন্তানদের দেখতে আসেনি। উল্টো রিনাকে ডিভোর্স লেটার (তালাকনামা) পাঠানো হয় এবং সন্তানদের বিক্রি করে কাবিনের টাকা শোধ করার মতো চরম ঘৃণ্য ও নিষ্ঠুর হুমকি দেওয়া হয়।

স্থানীয় ইউপি সদস্য নুহু মিয়াসহ মাতব্বররা দুই দফায় সালিশ-বৈঠকের আয়োজন করলেও রাকিবুল তা তোয়াক্কা করেনি। ঘটনাটি জানাজানি হলে এলাকায় তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয় এবং প্রশাসনের পক্ষ থেকেও কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়।

নেপথ্যে মহেশপুর থানার ওসির মানবিক মধ্যস্থতা
বিষয়টি মহেশপুর থানা পুলিশের নজরে আসার পর পরিস্থিতি দ্রুত রূপ নেয় ইতিবাচকতায়। নিষ্পাপ দুটি শিশু যেন পিতৃস্নেহ থেকে বঞ্চিত না হয় এবং একটি পরিবার যেন ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পায়, সেজন্য মহেশপুরে দায়িত্বরত অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মেহেদী হাসান অত্যন্ত বিচক্ষণ ও মানবিক উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তিনি উভয় পক্ষকে থানায় ডেকে নিয়ে বসেন। ওসির অত্যন্ত আন্তরিক ও আইনিCounseling-এর পর স্বামী রাকিবুল নিজের ভুল বুঝতে পারেন এবং কন্যাসন্তানদের প্রতি নিজের দায়িত্ব অনুধাবন করেন।

শত ক্ষোভ ভুলে যমজ সন্তানদের সুন্দর ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে এবং ওসির আন্তরিক মধ্যস্থতায় রিনা খাতুনও তার স্বামীকে ক্ষমা করে দেন।

অবশেষে মহেশপুর থানার ওসির টেবিলেই দীর্ঘদিনের ভুল বোঝাবুঝি ও আইনি জটিলতার অবসান ঘটে। মায়ের কোলে ফিরে আসে তার কলিজার টুকরো দুই সন্তান, আর স্বামী ফিরে পান তার স্ত্রীকে। নতুন করে সংসার সাজানোর এবং আজীবন একসাথে থাকার দৃঢ় অঙ্গীকার নিয়ে তারা থানা থেকে বিদায় নেন।

একটি চরম অমানবিক ও বর্বর ঘটনার এমন সুন্দর, মানবিক ও স্বস্তিদায়ক সমাপ্তি ঘটায় ভুক্তভোগী পরিবার, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং এলাকাবাসী মহেশপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মেহেদী হাসানের প্রতি গভীর ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :

মধ্যযুগীয় বর্বরতার অবসান: মহেশপুরে যমজ কন্যা জন্ম দেওয়ায় তালাকপ্রাপ্তা সেই রিনা ওসির হস্তক্ষেপে ফিরলেন স্বামীর সংসারে

আপডেট সময় : ০৯:৪৪:২৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬

একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়েও যমজ কন্যাসন্তান জন্ম দেওয়া যেন হয়েছিল এক মহাপাপ! আর এই ‘অপরাধে’ ঝিনাইদহের মহেশপুরে দেড় মাসের দুটি ফুটফুটে কন্যাসন্তানসহ রিনা খাতুন নামের এক ভাগ্যবিড়ম্বিত গৃহবধূকে তালাক দেওয়ার মতো এক মধ্যযুগীয় ও অমানবিক ঘটনা ঘটেছিল।

তবে সব অন্ধকার ও ভুল বোঝাবুঝির অবসান ঘটিয়ে অবশেষে সেই আলোচিত যমজ কন্যার মা পবিত্র সংসারের টানে আবার স্বামীর ঘরে ফিরেছেন। আজীবন একসাথে থাকার নতুন প্রতিশ্রুতি নিয়েছেন এই দম্পতি। আর এই ভাঙতে যাওয়া সংসারকে জোড়া লাগাতে এবং নিষ্পাপ দুটি শিশুর মুখে হাসি ফোটাতে অনন্য ও মানবিক ভূমিকা পালন করেছে মহেশপুর থানা পুলিশ।

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, প্রায় দুই বছর আগে মহেশপুর উপজেলার কাজিরবের ইউনিয়নের নতুন কোলা গ্রামের শহিদুল ইসলামের ছেলে রাকিবুল ইসলামের সঙ্গে পার্শ্ববর্তী পুরাতন কোলা গ্রামের মৃত পীর বক্সের মেয়ে রিনা খাতুনের পারিবারিকভাবে বিয়ে হয়। বিয়ের পর প্রথম দিনগুলো সুখের হলেও বিপত্তি ঘটে রিনা অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার পর। গর্ভধারণের ছয় মাস পর আল্ট্রাসনোগ্রাফি রিপোর্টে যখন জানা যায় গর্ভের সন্তান দুটিই ‘কন্যা’, ঠিক তখন থেকেই রিনার ওপর নেমে আসে অন্ধকার।

স্বামী রাকিবুল ও তার পরিবারের সদস্যরা কন্যাসন্তানের খবর মেনে নিতে না পেরে রিনার ওপর তীব্র মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন শুরু করে। একপর্যায়ে বাধ্য হয়ে বাবার বাড়িতে আশ্রয় নেন রিনা এবং সেখানেই অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে দুটি ফুটফুটে কন্যাসন্তানের জন্ম দেন।

শিশুদের বয়স দেড় মাস পার হয়ে গেলেও পাষণ্ড পিতা বা তার পরিবারের কেউ সন্তানদের দেখতে আসেনি। উল্টো রিনাকে ডিভোর্স লেটার (তালাকনামা) পাঠানো হয় এবং সন্তানদের বিক্রি করে কাবিনের টাকা শোধ করার মতো চরম ঘৃণ্য ও নিষ্ঠুর হুমকি দেওয়া হয়।

স্থানীয় ইউপি সদস্য নুহু মিয়াসহ মাতব্বররা দুই দফায় সালিশ-বৈঠকের আয়োজন করলেও রাকিবুল তা তোয়াক্কা করেনি। ঘটনাটি জানাজানি হলে এলাকায় তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয় এবং প্রশাসনের পক্ষ থেকেও কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়।

নেপথ্যে মহেশপুর থানার ওসির মানবিক মধ্যস্থতা
বিষয়টি মহেশপুর থানা পুলিশের নজরে আসার পর পরিস্থিতি দ্রুত রূপ নেয় ইতিবাচকতায়। নিষ্পাপ দুটি শিশু যেন পিতৃস্নেহ থেকে বঞ্চিত না হয় এবং একটি পরিবার যেন ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পায়, সেজন্য মহেশপুরে দায়িত্বরত অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মেহেদী হাসান অত্যন্ত বিচক্ষণ ও মানবিক উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তিনি উভয় পক্ষকে থানায় ডেকে নিয়ে বসেন। ওসির অত্যন্ত আন্তরিক ও আইনিCounseling-এর পর স্বামী রাকিবুল নিজের ভুল বুঝতে পারেন এবং কন্যাসন্তানদের প্রতি নিজের দায়িত্ব অনুধাবন করেন।

শত ক্ষোভ ভুলে যমজ সন্তানদের সুন্দর ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে এবং ওসির আন্তরিক মধ্যস্থতায় রিনা খাতুনও তার স্বামীকে ক্ষমা করে দেন।

অবশেষে মহেশপুর থানার ওসির টেবিলেই দীর্ঘদিনের ভুল বোঝাবুঝি ও আইনি জটিলতার অবসান ঘটে। মায়ের কোলে ফিরে আসে তার কলিজার টুকরো দুই সন্তান, আর স্বামী ফিরে পান তার স্ত্রীকে। নতুন করে সংসার সাজানোর এবং আজীবন একসাথে থাকার দৃঢ় অঙ্গীকার নিয়ে তারা থানা থেকে বিদায় নেন।

একটি চরম অমানবিক ও বর্বর ঘটনার এমন সুন্দর, মানবিক ও স্বস্তিদায়ক সমাপ্তি ঘটায় ভুক্তভোগী পরিবার, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং এলাকাবাসী মহেশপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মেহেদী হাসানের প্রতি গভীর ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন।