ঢাকা ০১:০৭ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১৭ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা হাবিবুর রহমান হাবিবের বিরুদ্ধে অপপ্রচারের প্রতিবাদে মানববন্ধন ঈশ্বরদীর পদ্মাপাড়ে সন্ত্রাসের আতঙ্ক, নিরাপত্তার দাবিতে মানববন্ধন বিএনপিকে ক্ষমতাচ্যুত করার ষড়যন্ত্রকারীদের রাজনীতি চিরতরে কবর দেওয়া হবে: হাবিবুর রহমান ঈশ্বরদীতে বসতবাড়ি দখল করে সীমানা প্রাচীর ও গেট নির্মাণ: হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ ঈশ্বরদীতে পোল্ট্রি খামারে বিদ্যুৎ স্পৃষ্টে যুবকের মৃত্যু ঈশ্বরদীতে সড়কের কাজের মান যাচাইয়ে মাঠে এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী সরকারি সফরের নামে স্ত্রী নিয়ে সচিবের ভ্রমণ কুমিল্লায় ১০ কেজি গাঁজাসহ গ্রেপ্তার ২  ঠাকুরগাঁওয়ে হিফজুল কুরআন ও হুসনে সওত প্রতিযোগিতা ও পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠিত ফরিদপুরে দ্বিতীয় শ্রেণীর শিক্ষার্থীকে ধর্ষণ চেষ্টা: সপ্তাহ পেরোলেও ধরাছোঁয়ার বাহিরে আসামি রুবেল

মরার পরও ভরসা নেই’, তাই নিজের কবর বানিয়ে রাখলেন মা

রহমত আরিফ ঠাকুরগাঁও সংবাদদাতাঃ
  • আপডেট সময় : ১১:৫৬:৩২ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬ ৭৭ বার পড়া হয়েছে

ঘরের পাশেই একটি কবর। প্রতিদিন ঘর থেকে বের হওয়ার সময় কবরটির পাশ দিয়েই হাঁটেন আয়েশা বেগম। কখনো দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকেন। যেন নিজের শেষ ঠিকানাটিই আগেভাগে দেখে নেন। মৃত্যুর পর সন্তানরা দাফনের দায়িত্ব নেবে সেই বিশ্বাস হারিয়েই জীবিত অবস্থায় নিজের কবর নিজেই প্রস্তুত করে রেখেছেন ৭০ বছর বয়সী এই বৃদ্ধা।

ঘটনাটি ঠাকুরগাঁওয়ের নবগঠিত ভূল্লী উপজেলার বালিয়া ইউনিয়নের বড়বালিয়া পাইকারমনি গ্রামের। আয়েশা বেগম ওই গ্রামের মৃত আয়নাল হকের স্ত্রী।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানায়, স্বামীর মৃত্যুর পর ধীরে ধীরে সন্তানদের কাছ থেকে দূরে সরে যেতে থাকেন আয়েশা বেগম। অভিযোগ রয়েছে, তিন ছেলে তার সম্পত্তি নিজেদের নামে লিখে নেওয়ার পর আর খোঁজখবর নেন না। কিছুদিন ছেলেদের বাড়িতে থাকলেও বনিবনা না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত সেখান থেকেও চলে আসতে হয় তাকে। পরে স্বামীর দেওয়া জমির ওপর একটি জরাজীর্ণ ঘর তুলে একাই বসবাস শুরু করেন তিনি। সেই ঘরের পাশেই নিজের হাতে একটি কবর তৈরি করে রেখেছেন আয়েশা বেগম। তার আশঙ্কা, মৃত্যুর পর সন্তানরা হয়তো দাফনের দায়িত্বও নেবে না। তাই জীবদ্দশাতেই শেষ আশ্রয়টুকু প্রস্তুত করে রেখেছেন।

বৃদ্ধার ঘরটিও মানবেতর অবস্থায় রয়েছে। টিনের চাল ফুটো হয়ে বৃষ্টির সময় ঘরের ভেতরে পানি পড়ে। নেই বিদ্যুৎ-সংযোগ। রাত কাটে অন্ধকারে। নিয়মিত খাবারেরও নিশ্চয়তা নেই। অনেক সময় না খেয়েই দিন পার করতে হয় তাকে। প্রতিবেশীদের দেওয়া সহায়তাই এখন তার বেঁচে থাকার প্রধান ভরসা।

কথা বলতে গিয়ে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়েন আয়েশা বেগম। তিনি বলেন, অনেক কষ্ট করে ছেলেদের মানুষ করেছি। এখন কেউ একবারও এসে জিজ্ঞেস করে না, ‘মা, তুমি কেমন আছো?’ ঘরে পানি পড়ে, অন্ধকারে থাকি। অনেক সময় না খেয়েও থাকতে হয়। আমার মৃত্যুর পর কী হবে, সেই চিন্তা থেকেই নিজের কবর বানিয়ে রেখেছি।

তিনি আরও বলেন, পাঁচ বছর হলো আমি একা থাকি। বর্ষার সময় এক হাটু পানি লাগে বাড়ির আঙ্গিনায়। মাছ-গোস্ত খাইনি অনেক দিন। ছেলেরা খোঁজও নেয় না। এখন প্রতিদিন মৃত্যুর দিন গণনা করছি। বিদায় নিতে পারলেই বাঁচি। এভাবে আর কত দিন বেচে থাকা যায় বলেন। যে সন্তানদের খেয়ে না খেয়ে বড় করলাম তারাই আজ আমাকে তাদের বোঝা মনে করে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে। এলাকাবাসীদের বলা আছে, আমি মারা গেলে তারা যেন আমার দাফনটা করে দেয়। আমার সন্তানের উপর কোনো ভরসা নেই আমার। বেঁচে থাকতেই খোঁজ নেয় না, আর মারা গেলে তো তারা বেঁচে যায়।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রায় পাঁচ বছর ধরে একাই বসবাস করছেন আয়েশা বেগম। এলাকার লোকজনই মাঝে মধ্যে খাবার ও প্রয়োজনীয় সহায়তা করেন। মৃত্যুর পর তাকে যেন এই কবরেই দাফন করা হয় এ কথাও তিনি স্থানীয়দের বলে রেখেছেন।

স্থানীয় বাসিন্দা বাপ্পী বলেন, চাচি প্রায়ই বলেন, মারা গেলে তাকে যেন এই কবরেই দাফন করা হয়। তার ছেলেরা সবাই ব্যবসা করেন, আর্থিক অবস্থাও ভালো। কিন্তু কেউ মায়ের খোঁজ নেন না। আমরা বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে গেলেও উল্টো আমাদের সঙ্গেই খারাপ আচরণ করা হয়।

এ বিষয়ে আয়েশা বেগমের দুই ছেলের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কাউকে পাওয়া যায়নি।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :

মরার পরও ভরসা নেই’, তাই নিজের কবর বানিয়ে রাখলেন মা

আপডেট সময় : ১১:৫৬:৩২ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬

ঘরের পাশেই একটি কবর। প্রতিদিন ঘর থেকে বের হওয়ার সময় কবরটির পাশ দিয়েই হাঁটেন আয়েশা বেগম। কখনো দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকেন। যেন নিজের শেষ ঠিকানাটিই আগেভাগে দেখে নেন। মৃত্যুর পর সন্তানরা দাফনের দায়িত্ব নেবে সেই বিশ্বাস হারিয়েই জীবিত অবস্থায় নিজের কবর নিজেই প্রস্তুত করে রেখেছেন ৭০ বছর বয়সী এই বৃদ্ধা।

ঘটনাটি ঠাকুরগাঁওয়ের নবগঠিত ভূল্লী উপজেলার বালিয়া ইউনিয়নের বড়বালিয়া পাইকারমনি গ্রামের। আয়েশা বেগম ওই গ্রামের মৃত আয়নাল হকের স্ত্রী।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানায়, স্বামীর মৃত্যুর পর ধীরে ধীরে সন্তানদের কাছ থেকে দূরে সরে যেতে থাকেন আয়েশা বেগম। অভিযোগ রয়েছে, তিন ছেলে তার সম্পত্তি নিজেদের নামে লিখে নেওয়ার পর আর খোঁজখবর নেন না। কিছুদিন ছেলেদের বাড়িতে থাকলেও বনিবনা না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত সেখান থেকেও চলে আসতে হয় তাকে। পরে স্বামীর দেওয়া জমির ওপর একটি জরাজীর্ণ ঘর তুলে একাই বসবাস শুরু করেন তিনি। সেই ঘরের পাশেই নিজের হাতে একটি কবর তৈরি করে রেখেছেন আয়েশা বেগম। তার আশঙ্কা, মৃত্যুর পর সন্তানরা হয়তো দাফনের দায়িত্বও নেবে না। তাই জীবদ্দশাতেই শেষ আশ্রয়টুকু প্রস্তুত করে রেখেছেন।

বৃদ্ধার ঘরটিও মানবেতর অবস্থায় রয়েছে। টিনের চাল ফুটো হয়ে বৃষ্টির সময় ঘরের ভেতরে পানি পড়ে। নেই বিদ্যুৎ-সংযোগ। রাত কাটে অন্ধকারে। নিয়মিত খাবারেরও নিশ্চয়তা নেই। অনেক সময় না খেয়েই দিন পার করতে হয় তাকে। প্রতিবেশীদের দেওয়া সহায়তাই এখন তার বেঁচে থাকার প্রধান ভরসা।

কথা বলতে গিয়ে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়েন আয়েশা বেগম। তিনি বলেন, অনেক কষ্ট করে ছেলেদের মানুষ করেছি। এখন কেউ একবারও এসে জিজ্ঞেস করে না, ‘মা, তুমি কেমন আছো?’ ঘরে পানি পড়ে, অন্ধকারে থাকি। অনেক সময় না খেয়েও থাকতে হয়। আমার মৃত্যুর পর কী হবে, সেই চিন্তা থেকেই নিজের কবর বানিয়ে রেখেছি।

তিনি আরও বলেন, পাঁচ বছর হলো আমি একা থাকি। বর্ষার সময় এক হাটু পানি লাগে বাড়ির আঙ্গিনায়। মাছ-গোস্ত খাইনি অনেক দিন। ছেলেরা খোঁজও নেয় না। এখন প্রতিদিন মৃত্যুর দিন গণনা করছি। বিদায় নিতে পারলেই বাঁচি। এভাবে আর কত দিন বেচে থাকা যায় বলেন। যে সন্তানদের খেয়ে না খেয়ে বড় করলাম তারাই আজ আমাকে তাদের বোঝা মনে করে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে। এলাকাবাসীদের বলা আছে, আমি মারা গেলে তারা যেন আমার দাফনটা করে দেয়। আমার সন্তানের উপর কোনো ভরসা নেই আমার। বেঁচে থাকতেই খোঁজ নেয় না, আর মারা গেলে তো তারা বেঁচে যায়।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রায় পাঁচ বছর ধরে একাই বসবাস করছেন আয়েশা বেগম। এলাকার লোকজনই মাঝে মধ্যে খাবার ও প্রয়োজনীয় সহায়তা করেন। মৃত্যুর পর তাকে যেন এই কবরেই দাফন করা হয় এ কথাও তিনি স্থানীয়দের বলে রেখেছেন।

স্থানীয় বাসিন্দা বাপ্পী বলেন, চাচি প্রায়ই বলেন, মারা গেলে তাকে যেন এই কবরেই দাফন করা হয়। তার ছেলেরা সবাই ব্যবসা করেন, আর্থিক অবস্থাও ভালো। কিন্তু কেউ মায়ের খোঁজ নেন না। আমরা বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে গেলেও উল্টো আমাদের সঙ্গেই খারাপ আচরণ করা হয়।

এ বিষয়ে আয়েশা বেগমের দুই ছেলের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কাউকে পাওয়া যায়নি।