ঢাকা ১২:৪৬ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২০ এপ্রিল ২০২৬, ৬ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

 পেঁয়াজের দর পতনে দিশেহারা কৃষক

তুহিন হোসেন
  • আপডেট সময় : ০৩:৩৯:৫৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ২২ জানুয়ারী ২০২৫ ১৬১ বার পড়া হয়েছে

বিস্তীর্ণ পদ্মার চর জুরে মুড়িকাটা পেঁয়াজ তোলায় ব্যস্ত সময় পার করছেন ঈশ্বরদীর চাষীরা। জমি থেকে সংগ্রহ করা পেঁয়াজ গৃহস্থের বাড়িতে নিয়ে বাছাইয়ের পর সেই পেঁয়াজ বিক্রির উপযোগী করে তোলার কাজে ব্যস্ত এ অঞ্চলের কৃষক কৃষানীরা।

প্রমত্মা পদ্মাচরের উর্বর মাটি আর পেঁয়াজ বাজারের ধারাবাহিক উর্দ্ধমূখী থাকায় বরাবর উচ্চ মুনাফা পাওয়ায় এ অঞ্চলসহ আশপাশের অঞ্চলেও মুড়িকাটা পেয়াজের চাষ হয়েছে অন্যান্য বারের তুলনায় দ্বিগুন। দ্বিগুন চাষের সাথে বাম্পার ফলন হলেও দরপতনের আশঙ্কায় দিশেহারা এ অঞ্চলের কৃষকরা। তারা বলছে অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার পেঁয়াজের দাম আশঙ্কা জনক হারে কমছে। এভাবে কমতে থাকলে বছর শেষে পেঁয়াজ চাষে আমাদের বড় অংকের লোকশান গুনতে হবে।

সরে জমিনে গিয়ে জানা যায় ঈশ্বরদী উপজেলার লক্ষীকুন্ডা ইউনিয়নের কৈকুন্ডা, লক্ষ্মীকুন্ডা, প্রমত্তা পদ্মার বিস্তীর্ণীচর, ছলিমপুর, ভাড়ইমারী, নওদাপাড়া সহ আশপাশের অন্তত ২০ টি গ্রামে মুড়ি কাটা পেঁয়াজের আবাদ হয়। রোপনের সময়ে প্রতিকূল আবহাওয়ায় ফলন বিপর্যয়। উত্তোলন মৌসুমে দাম কমে যাওয়ায় দিশেহারা কৃষক। পেঁয়াজের আকস্মিক দরপতনে কৃষকের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে। তাই ন্যায্য মূল্য নিশ্চিতে পেঁয়াজ উত্তোলন মৌসুমে বিদেশি পেঁয়াজ আমদানি সাময়িক বন্ধের দাবি জানিয়েছেন কৃষকরা।
ঈশ্বরদীর শহরসহ উপজেলার বিভিন্ন বীজের দোকান এবং কৃষকদের থেকে জানা যায়, প্রতিকেজি পেঁয়াজের বীজ ৮০০০-১০০০০ হাজার টাকায় ক্রয়/ বিক্রয় হয়েছে। কৃষকরা বলছেন, এ রকম বীজ গত বছর রোপণ মৌসুমে ৪ হাজার থেকে সাড়ে ৫ হাজার টাকা দরে ক্রয় করেছেন তারা । এবার উচ্চমূল্য দিয়ে কৃষককে পেয়াজের বীজ ক্রয় করতে হয়েছে কৃষকদের। সেই তুলনায় বর্তমান পেয়াজের পাইকারি বাজার হচ্ছে ১৩০০ থেকে ১৫০০ টাকা মণ। এতে লোকসানে পড়েছেন কৃষকরা।

কামালপুরের পেঁয়াজ চাষী শিহাব প্রামানিক বলেন, পেঁয়াজের ভালো ফলন হলেও আমাদের দিন কাটছে হতাশায়। কারণ পেঁয়াজের দাম তেমন পাচ্ছিনা। আমাদের প্রতি বিঘা পেঁয়াজ আবাদে খরচ হয়েছে ৯০,০০০/= (নব্বই) থেকে ১,২০,০০০/= (এক লক্ষ বিশ হাজার) টাকা পর্যন্ত।

লক্ষীকুন্ডার রাজ্জাক আলী জানান, এবার পেঁয়াজ আবাদ করে আমরা শেষ হয়ে গেছি। সব স্বপ্ন শেষ হয়ে গেছে। ১৩০০/= (এক হাজার তিনশ) থেকে ১৫০০/= (এক হাজার পাঁচশ) টাকা মণ বিক্রি করতে হচ্ছে আমাদের এ পেঁয়াজ। লাভের চেয়ে লোকসানই বেশী।

পেঁয়াজ চাষী শামিম প্রামানিক বলেন, এ পেঁয়াজ বিক্রয় যোগ্য করে তুলতে কেজিতে আমাদের ২৫/৩৫ টাকা খরচ হয়েছে আর বিক্রি করছি অর্ধেক দামে, এতে আমাদের আবাদের প্রতি আর ইচ্ছে হচ্ছেনা, আগ্রহ হারিয়ে গেছে। যদি সরকারী সহযোগীতা পাই তা হলে আমরা একটু হলেও উপকৃত হবো। পরবর্তীতে আবার আবাদ করতে পারবো।

তবে কৃষি বিভাগ বলছে, এ মৌসুমে পেঁয়াজ বীজের দাম বেশি। তারপরও কৃষকরা পেঁয়াজ রোপণ করবেন। কেননা গত বছর পেঁয়াজ চাষ করে ভালো দাম পেয়েছেন কৃষকরা। খরচ বেশি হলেও পেঁয়াজ চাষ ব্যাহত হবে না।
বীজের দাম অস্বাভাবিক হওয়ায় আশা ভঙ্গ হয়েছে কৃষকদের। বীজের প্রকার ভেদে এক বিঘা জমিতে ৩ থেকে ৪কেজি বীজ প্রয়োজন হয়। সে হিসেবে এক বিঘা জমির জন্য বীজ কিনতে লাগবে তাদের ৩২ থেকে ৪০ হাজার টাকা। আবাদে জমি চাষ, রাসায়নিক সার, সেচ ও শ্রমিকের মজুরি তো আছেই।

ঈশ্বরদী উপজেলা কৃষি অফিসার মিতা সরকার বলেন, উপজেলায় চলতি মৌসুমে পেঁয়াজ রোপণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৯২০ হেক্টর জমিতে। যার মোট উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ১৩ হাজার ২১৬ মেট্রিক টন পেঁয়াজ। তবে বেশি দামের আশায় অনেক কৃষক একসঙ্গে পেঁয়াজ বাজারে নেয়ায় দাম কমেছে। আমরা কৃষকদের পরামর্শ দিচ্ছি অপরিপক্ব পেঁয়াজ জমি থেকে না তোলার। পরিপক্ক হওয়ার পর ধীরে ধীরে পেঁয়াজ তোলা ও বাজার দেখে বিক্রি করলে আশা করছি দাম আবার বাড়বে।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :

 পেঁয়াজের দর পতনে দিশেহারা কৃষক

আপডেট সময় : ০৩:৩৯:৫৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ২২ জানুয়ারী ২০২৫

বিস্তীর্ণ পদ্মার চর জুরে মুড়িকাটা পেঁয়াজ তোলায় ব্যস্ত সময় পার করছেন ঈশ্বরদীর চাষীরা। জমি থেকে সংগ্রহ করা পেঁয়াজ গৃহস্থের বাড়িতে নিয়ে বাছাইয়ের পর সেই পেঁয়াজ বিক্রির উপযোগী করে তোলার কাজে ব্যস্ত এ অঞ্চলের কৃষক কৃষানীরা।

প্রমত্মা পদ্মাচরের উর্বর মাটি আর পেঁয়াজ বাজারের ধারাবাহিক উর্দ্ধমূখী থাকায় বরাবর উচ্চ মুনাফা পাওয়ায় এ অঞ্চলসহ আশপাশের অঞ্চলেও মুড়িকাটা পেয়াজের চাষ হয়েছে অন্যান্য বারের তুলনায় দ্বিগুন। দ্বিগুন চাষের সাথে বাম্পার ফলন হলেও দরপতনের আশঙ্কায় দিশেহারা এ অঞ্চলের কৃষকরা। তারা বলছে অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার পেঁয়াজের দাম আশঙ্কা জনক হারে কমছে। এভাবে কমতে থাকলে বছর শেষে পেঁয়াজ চাষে আমাদের বড় অংকের লোকশান গুনতে হবে।

সরে জমিনে গিয়ে জানা যায় ঈশ্বরদী উপজেলার লক্ষীকুন্ডা ইউনিয়নের কৈকুন্ডা, লক্ষ্মীকুন্ডা, প্রমত্তা পদ্মার বিস্তীর্ণীচর, ছলিমপুর, ভাড়ইমারী, নওদাপাড়া সহ আশপাশের অন্তত ২০ টি গ্রামে মুড়ি কাটা পেঁয়াজের আবাদ হয়। রোপনের সময়ে প্রতিকূল আবহাওয়ায় ফলন বিপর্যয়। উত্তোলন মৌসুমে দাম কমে যাওয়ায় দিশেহারা কৃষক। পেঁয়াজের আকস্মিক দরপতনে কৃষকের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে। তাই ন্যায্য মূল্য নিশ্চিতে পেঁয়াজ উত্তোলন মৌসুমে বিদেশি পেঁয়াজ আমদানি সাময়িক বন্ধের দাবি জানিয়েছেন কৃষকরা।
ঈশ্বরদীর শহরসহ উপজেলার বিভিন্ন বীজের দোকান এবং কৃষকদের থেকে জানা যায়, প্রতিকেজি পেঁয়াজের বীজ ৮০০০-১০০০০ হাজার টাকায় ক্রয়/ বিক্রয় হয়েছে। কৃষকরা বলছেন, এ রকম বীজ গত বছর রোপণ মৌসুমে ৪ হাজার থেকে সাড়ে ৫ হাজার টাকা দরে ক্রয় করেছেন তারা । এবার উচ্চমূল্য দিয়ে কৃষককে পেয়াজের বীজ ক্রয় করতে হয়েছে কৃষকদের। সেই তুলনায় বর্তমান পেয়াজের পাইকারি বাজার হচ্ছে ১৩০০ থেকে ১৫০০ টাকা মণ। এতে লোকসানে পড়েছেন কৃষকরা।

কামালপুরের পেঁয়াজ চাষী শিহাব প্রামানিক বলেন, পেঁয়াজের ভালো ফলন হলেও আমাদের দিন কাটছে হতাশায়। কারণ পেঁয়াজের দাম তেমন পাচ্ছিনা। আমাদের প্রতি বিঘা পেঁয়াজ আবাদে খরচ হয়েছে ৯০,০০০/= (নব্বই) থেকে ১,২০,০০০/= (এক লক্ষ বিশ হাজার) টাকা পর্যন্ত।

লক্ষীকুন্ডার রাজ্জাক আলী জানান, এবার পেঁয়াজ আবাদ করে আমরা শেষ হয়ে গেছি। সব স্বপ্ন শেষ হয়ে গেছে। ১৩০০/= (এক হাজার তিনশ) থেকে ১৫০০/= (এক হাজার পাঁচশ) টাকা মণ বিক্রি করতে হচ্ছে আমাদের এ পেঁয়াজ। লাভের চেয়ে লোকসানই বেশী।

পেঁয়াজ চাষী শামিম প্রামানিক বলেন, এ পেঁয়াজ বিক্রয় যোগ্য করে তুলতে কেজিতে আমাদের ২৫/৩৫ টাকা খরচ হয়েছে আর বিক্রি করছি অর্ধেক দামে, এতে আমাদের আবাদের প্রতি আর ইচ্ছে হচ্ছেনা, আগ্রহ হারিয়ে গেছে। যদি সরকারী সহযোগীতা পাই তা হলে আমরা একটু হলেও উপকৃত হবো। পরবর্তীতে আবার আবাদ করতে পারবো।

তবে কৃষি বিভাগ বলছে, এ মৌসুমে পেঁয়াজ বীজের দাম বেশি। তারপরও কৃষকরা পেঁয়াজ রোপণ করবেন। কেননা গত বছর পেঁয়াজ চাষ করে ভালো দাম পেয়েছেন কৃষকরা। খরচ বেশি হলেও পেঁয়াজ চাষ ব্যাহত হবে না।
বীজের দাম অস্বাভাবিক হওয়ায় আশা ভঙ্গ হয়েছে কৃষকদের। বীজের প্রকার ভেদে এক বিঘা জমিতে ৩ থেকে ৪কেজি বীজ প্রয়োজন হয়। সে হিসেবে এক বিঘা জমির জন্য বীজ কিনতে লাগবে তাদের ৩২ থেকে ৪০ হাজার টাকা। আবাদে জমি চাষ, রাসায়নিক সার, সেচ ও শ্রমিকের মজুরি তো আছেই।

ঈশ্বরদী উপজেলা কৃষি অফিসার মিতা সরকার বলেন, উপজেলায় চলতি মৌসুমে পেঁয়াজ রোপণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৯২০ হেক্টর জমিতে। যার মোট উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ১৩ হাজার ২১৬ মেট্রিক টন পেঁয়াজ। তবে বেশি দামের আশায় অনেক কৃষক একসঙ্গে পেঁয়াজ বাজারে নেয়ায় দাম কমেছে। আমরা কৃষকদের পরামর্শ দিচ্ছি অপরিপক্ব পেঁয়াজ জমি থেকে না তোলার। পরিপক্ক হওয়ার পর ধীরে ধীরে পেঁয়াজ তোলা ও বাজার দেখে বিক্রি করলে আশা করছি দাম আবার বাড়বে।