জীর্ণশীর্ণ শতবর্ষী পিতলের রথ, হারিয়ে যাচ্ছে মান্দার ঐতিহ্যএকসময় ১০ দিনের জমজমাট রথযাত্রা মেলা, এখন নেই সেই প্রাণচাঞ্চল্য
- আপডেট সময় : ০৯:৫৬:৫২ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬ ৬০ বার পড়া হয়েছে
নওগাঁর মান্দা উপজেলার বুড়িদহ বাজারের শতবর্ষী পিতলের রথ আজ ইতিহাসের নীরব সাক্ষী। একসময় যে রথকে ঘিরে হাজারো মানুষের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠত বুড়িদহ বাজার, আজ সেটি জীর্ণশীর্ণ অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে স্মৃতির ভার বহন করে। হারিয়ে গেছে ঐতিহ্যবাহী রথযাত্রা মেলা, বন্ধ হয়ে গেছে লোকজ সংস্কৃতির প্রাণবন্ত আয়োজন। ফলে উত্তর বাংলার এক ঐতিহাসিক ঐতিহ্য এখন বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে।
আগামীকাল বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) আষাঢ় মাসের শুক্লা পক্ষের দ্বিতীয়া তিথিতে জগন্নাথ দেবের রথযাত্রা অনুষ্ঠিত হবে। তবে আগের মতো বুড়িদহ বাজারে নয়, এবারও শামুকখোল গ্রামে পারিবারিকভাবে রথ টানা হবে। থাকছে না শতবর্ষের ঐতিহ্যবাহী সেই মেলার আয়োজন।
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, প্রায় একশ বছরেরও বেশি সময় ধরে বুড়িদহ বাজারে জগন্নাথ দেবের রথযাত্রাকে কেন্দ্র করে ১০ দিনব্যাপী বিশাল মেলা বসত। মেলার প্রধান আকর্ষণ ছিল মাটির পুতুল, খেলনা, মিষ্টির দোকান, বাঁশ-বেতের তৈরি নানা সামগ্রী, কৃষিপণ্য, নাগরদোলা, সার্কাস, যাত্রাপালা, কবিগান, বাউল গান ও কীর্তন। উৎসবকে ঘিরে দূর-দূরান্ত থেকে আত্মীয়-স্বজনরা আসতেন। পুরো এলাকা পরিণত হতো মিলনমেলায়।
ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, শামুকখোল গ্রামের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী নিভর্ষী মোহন প্রামাণিক ব্যবসার কাজে প্রায়ই কলকাতায় যেতেন। সেখানকার বউবাজার, পোস্তা ও জানবাজার এলাকায় পিতলের তৈরি রথ দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি নিজ উদ্যোগে একটি বিশাল রথ নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেন। ১৩১৬ বঙ্গাব্দে (১৯০৯-১৯১০ খ্রিস্টাব্দ) কলকাতার দক্ষ সূত্রধর, ভাস্কর, লৌহকার ও রংমিস্ত্রিদের মাধ্যমে নির্মিত হয় এই দৃষ্টিনন্দন পিতলের রথ। পরে নৌপথে সেটি বুড়িদহ বাজারে আনা হয় এবং সেখান থেকেই রথযাত্রার আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়।
নিভর্ষী মোহন প্রামাণিকের উত্তরসূরী মোহিনী মোহন প্রামাণিক জানান, দীর্ঘদিন খোলা জায়গায় থাকায় রথটির বিভিন্ন মূল্যবান পিতলের মূর্তি চুরি হয়ে যায়। নিরাপত্তার স্বার্থে পরে রথটি তাঁদের বাড়ির খলিয়ানে স্থানান্তর করা হয়। তবে বয়সের ভারে এখন রথটির অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। জরুরি ভিত্তিতে সংস্কার না করলে এই ঐতিহাসিক নিদর্শনটি চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও রথের আরেক উত্তরসূরী দেবাশীষ কুমার প্রামাণিক বলেন, রথযাত্রা শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি বাংলার লোকসংস্কৃতি, সামাজিক সম্প্রীতি ও গ্রামীণ ঐতিহ্যের এক অনন্য প্রতীক। বুড়িদহ বাজারের রথযাত্রার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি। হিন্দু-মুসলিমসহ বিভিন্ন ধর্মের মানুষ একসঙ্গে রথ টানতেন, মেলায় অংশ নিতেন, ব্যবসা করতেন এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপভোগ করতেন। এটি ছিল পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহাবস্থান ও সামাজিক ঐক্যের উজ্জ্বল উদাহরণ।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, শতবর্ষী এই পিতলের রথকে প্রত্নঐতিহ্য হিসেবে সংরক্ষণ, প্রয়োজনীয় সংস্কার, গবেষণা ও প্রামাণ্য দলিল সংরক্ষণের পাশাপাশি ঐতিহ্যবাহী রথযাত্রা মেলাটি পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। কারণ এই রথ শুধু একটি ধর্মীয় নিদর্শন নয়, এটি উত্তর বাংলার ইতিহাস, লোকজ সংস্কৃতি ও সম্প্রীতির অমূল্য স্মারক, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ করা সময়ের দাবি।















