ঢাকা ১১:১৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
খালেদা জিয়ার স্মরণে ফুটবল টুর্নামেন্টের উদ্বোধন নেশার টাকা চেয়ে বাবা-মাকে মারধরে ছেলের বিরুদ্ধে মামলা কাহারোলে তথ্য চাওয়ায় দুই সাংবাদিককে অবরুদ্ধ, ইউএনও’র হস্তক্ষেপে উদ্ধার লালপুরে পুলিশ সদস্যসহ ইয়াবা নিয়ে গ্রেপ্তার ৩ ঈশ্বরদীতে আওয়ামী লীগের ‘গুপ্ত মিছিলের’ প্রতিবাদে বিএনপির বিক্ষোভ মিছিল জাকারিয়া পিন্টু ও সহযোগীদের গ্রেপ্তারের দাবিতে পাবনায় মানববন্ধন রাষ্ট্রপতির সঙ্গে রুয়েট উপাচার্যের সৌজন্য সাক্ষাৎ, ষষ্ঠ সমাবর্তন জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে পাবনায় ইয়াবাসহ দুই কারবারি আটক, কারাদণ্ড ৩ মাদকসেবীর সত্যের পক্ষে এক সাহসিক কলম যোদ্ধা : সায়েক এম রহমান  বাংলাদেশ প্রেসক্লাব পাবনা জেলা শাখার মিলন মেলা ও পরিচিতি সভা অনুষ্ঠিত

ঋণের বোঝা কাঁধে নিয়ে প্রথমবার সাগরে, আর ফেরা হলো না আক্কাসের

মোঃ নুর নবী, দশমিনা (পটুয়াখালী) প্রতিনিধি
  • আপডেট সময় : ০৪:৪৪:৩২ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই ২০২৬ ৬৫ বার পড়া হয়েছে

সংসারের অভাব, মাথার ওপর ঋণের চাপ আর ভবিষ্যতে একটি অটো (বোরাক) কেনার স্বপ্ন—এই তিনটি কারণই ২৫ বছর বয়সী মো. আক্কাসকে প্রথমবারের মতো গভীর সাগরে মাছ ধরতে যেতে হয়েছিল। কিন্তু সেই যাত্রাই যেন হয়ে উঠল জীবনের শেষ যাত্রা। বঙ্গোপসাগরে ট্রলারডুবির প্রায় তিন দিন পার হলেও এখনো নিখোঁজ রয়েছেন আক্কাসসহ ছয় জেলে।

গত রোববার রাতে কুয়াকাটা উপকূল থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে উত্তাল সাগরে প্রবল স্রোত ও কয়েক মিটার উচ্চতার ঢেউয়ের আঘাতে একটি মাছ ধরার ট্রলার উল্টে যায়। ট্রলারে থাকা ১১ জেলের মধ্যে দুজন বাইরে থাকলেও বাকি নয়জন ট্রলারের ব্রিজের ভেতরে আটকা পড়েন। পরে তাদের মধ্যে ছয়জন বের হতে সক্ষম হলেও তিনজন আর বের হতে পারেননি। এ ঘটনায় পাঁচজনকে জীবিত উদ্ধার করা হলেও আক্কাসসহ ছয়জন এখনো নিখোঁজ রয়েছেন।নিখোঁজরা হলেন— এমাদুল খাঁ (৪৫), হারুন হাওলাদার (৪৫), ফোরকান সিকদার (৫৫), সায়েম (২০), আল-আমিন (২২) ও মো. আক্কাস (২৫)।

গলাচিপা পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের চৌরাস্তা মসজিদসংলগ্ন আক্কাসের ভাড়া বাসায় এখন শুধুই অপেক্ষা আর কান্না। মা শাহানাজ বেগম বারবার সন্তানের ফেরার আশায় চোখের পানি ফেলছেন। স্ত্রী প্রাপ্তি বেগম স্বামীর শোকে বারবার অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। আর সাড়ে তিন বছরের ছেলে আলভি বুঝতেই পারছে না কী ঘটেছে। সে শুধু তার নানাকে ফোন করে বারবার বলছে, “বাবাকে নিয়ে আসো।”

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, আক্কাসের বাবার মৃত্যুর পর দীর্ঘদিন ঢাকায় একটি গার্মেন্টসে চাকরি করতেন তিনি। পরে গলাচিপা উপজেলার সদর ইউনিয়নের পক্ষিয়া গ্রামে নানাবাড়ির সুবাদে সেখানে বসবাস শুরু করেন। ছয় বছর আগে বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলার মরহুম নাসির উদ্দীনের ছেলে আক্কাস রাঙ্গাবালী উপজেলার বড়বাইশদিয়া ইউনিয়নের হানিফ মিয়ার মেয়ে প্রাপ্তিকে বিয়ে করেন। তাদের সংসারে আলভি নামে সাড়ে তিন বছরের একটি ছেলে রয়েছে।

আক্কাসের খালা, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মোসা. ফারআনা জানান, ঋণের প্রায় ৬০ হাজার টাকা পরিশোধ এবং একটি বোরাক কেনার স্বপ্ন থেকেই প্রথমবার জেলেদের সাথে মাছ ধরার ট্রলারে যোগ দেন আক্কাস। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, প্রথম সমুদ্রযাত্রাই তাকে নিখোঁজের তালিকায় ঠাঁই করে দিয়েছে।

স্ত্রী প্রাপ্তি বেগম বলেন, “অভাবের কারণে আর কোনো উপায় ছিল না। লোনের টাকা শোধ করতে প্রথমবার সাগরে গিয়েছিল। ও ভালোভাবে সাঁতারও জানত না। এখন শুধু আল্লাহর কাছে চাই, অন্তত ওর একটা খোঁজ যেন পাই।”

শ্বশুর হানিফ মিয়া জানান, নিখোঁজের খবর পাওয়ার পর থেকেই তিনি কুয়াকাটা উপকূলের বিভিন্ন এলাকায় ছুটে বেড়াচ্ছেন। গঙ্গামতি, হাসাখালী, চাপালীসহ বিভিন্ন স্থানে খোঁজ করেও এখন পর্যন্ত জামাইয়ের কোনো সন্ধান মেলেনি।

দিন যত গড়াচ্ছে, পরিবারের জীবিত ফিরে পাওয়ার আশা ততই ক্ষীণ হয়ে আসছে। এখন স্বজনদের একটাই আকুতি—যদি জীবিত না-ও ফেরে, অন্তত যেন আক্কাসের মরদেহটি ফিরে পাওয়া যায়।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :

ঋণের বোঝা কাঁধে নিয়ে প্রথমবার সাগরে, আর ফেরা হলো না আক্কাসের

আপডেট সময় : ০৪:৪৪:৩২ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই ২০২৬

সংসারের অভাব, মাথার ওপর ঋণের চাপ আর ভবিষ্যতে একটি অটো (বোরাক) কেনার স্বপ্ন—এই তিনটি কারণই ২৫ বছর বয়সী মো. আক্কাসকে প্রথমবারের মতো গভীর সাগরে মাছ ধরতে যেতে হয়েছিল। কিন্তু সেই যাত্রাই যেন হয়ে উঠল জীবনের শেষ যাত্রা। বঙ্গোপসাগরে ট্রলারডুবির প্রায় তিন দিন পার হলেও এখনো নিখোঁজ রয়েছেন আক্কাসসহ ছয় জেলে।

গত রোববার রাতে কুয়াকাটা উপকূল থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে উত্তাল সাগরে প্রবল স্রোত ও কয়েক মিটার উচ্চতার ঢেউয়ের আঘাতে একটি মাছ ধরার ট্রলার উল্টে যায়। ট্রলারে থাকা ১১ জেলের মধ্যে দুজন বাইরে থাকলেও বাকি নয়জন ট্রলারের ব্রিজের ভেতরে আটকা পড়েন। পরে তাদের মধ্যে ছয়জন বের হতে সক্ষম হলেও তিনজন আর বের হতে পারেননি। এ ঘটনায় পাঁচজনকে জীবিত উদ্ধার করা হলেও আক্কাসসহ ছয়জন এখনো নিখোঁজ রয়েছেন।নিখোঁজরা হলেন— এমাদুল খাঁ (৪৫), হারুন হাওলাদার (৪৫), ফোরকান সিকদার (৫৫), সায়েম (২০), আল-আমিন (২২) ও মো. আক্কাস (২৫)।

গলাচিপা পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের চৌরাস্তা মসজিদসংলগ্ন আক্কাসের ভাড়া বাসায় এখন শুধুই অপেক্ষা আর কান্না। মা শাহানাজ বেগম বারবার সন্তানের ফেরার আশায় চোখের পানি ফেলছেন। স্ত্রী প্রাপ্তি বেগম স্বামীর শোকে বারবার অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। আর সাড়ে তিন বছরের ছেলে আলভি বুঝতেই পারছে না কী ঘটেছে। সে শুধু তার নানাকে ফোন করে বারবার বলছে, “বাবাকে নিয়ে আসো।”

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, আক্কাসের বাবার মৃত্যুর পর দীর্ঘদিন ঢাকায় একটি গার্মেন্টসে চাকরি করতেন তিনি। পরে গলাচিপা উপজেলার সদর ইউনিয়নের পক্ষিয়া গ্রামে নানাবাড়ির সুবাদে সেখানে বসবাস শুরু করেন। ছয় বছর আগে বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলার মরহুম নাসির উদ্দীনের ছেলে আক্কাস রাঙ্গাবালী উপজেলার বড়বাইশদিয়া ইউনিয়নের হানিফ মিয়ার মেয়ে প্রাপ্তিকে বিয়ে করেন। তাদের সংসারে আলভি নামে সাড়ে তিন বছরের একটি ছেলে রয়েছে।

আক্কাসের খালা, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মোসা. ফারআনা জানান, ঋণের প্রায় ৬০ হাজার টাকা পরিশোধ এবং একটি বোরাক কেনার স্বপ্ন থেকেই প্রথমবার জেলেদের সাথে মাছ ধরার ট্রলারে যোগ দেন আক্কাস। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, প্রথম সমুদ্রযাত্রাই তাকে নিখোঁজের তালিকায় ঠাঁই করে দিয়েছে।

স্ত্রী প্রাপ্তি বেগম বলেন, “অভাবের কারণে আর কোনো উপায় ছিল না। লোনের টাকা শোধ করতে প্রথমবার সাগরে গিয়েছিল। ও ভালোভাবে সাঁতারও জানত না। এখন শুধু আল্লাহর কাছে চাই, অন্তত ওর একটা খোঁজ যেন পাই।”

শ্বশুর হানিফ মিয়া জানান, নিখোঁজের খবর পাওয়ার পর থেকেই তিনি কুয়াকাটা উপকূলের বিভিন্ন এলাকায় ছুটে বেড়াচ্ছেন। গঙ্গামতি, হাসাখালী, চাপালীসহ বিভিন্ন স্থানে খোঁজ করেও এখন পর্যন্ত জামাইয়ের কোনো সন্ধান মেলেনি।

দিন যত গড়াচ্ছে, পরিবারের জীবিত ফিরে পাওয়ার আশা ততই ক্ষীণ হয়ে আসছে। এখন স্বজনদের একটাই আকুতি—যদি জীবিত না-ও ফেরে, অন্তত যেন আক্কাসের মরদেহটি ফিরে পাওয়া যায়।