মৃত্যুকে খুব কাছ থেকে দেখেছি বন্যহাতির আক্রমণের শিকার আবদুল রহিম
- আপডেট সময় : ১১:০৪:১৫ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৪ নভেম্বর ২০২৪ ২৭১ বার পড়া হয়েছে
আবদুল রহিম (৪৮) ছিলেন একজন প্রবাসী।দীর্ঘ ১২ বছর বিদেশের মাটিতে শ্রম দিয়ে কোন ভাল সফলতা অর্জন করতে না পারায়।অবশেষে নিজের জন্মভূমি বাংলাদেশের পাড়ি দিয়ে ধার’দেনা করে দিয়েছে মুরগি পোলট্রি খামার। অবসর সময়কে কাজে লাগিয়ে ব্যস্ত সময় কাটান ভাগা কৃষি জমিতে।বন্যহাতি তান্ডব চালিয়ে খেয়ে পেলছেন ভাগা চাষ করা ২শতক জমিনের ধান আরও নষ্ট করে দিয়ে শাকসবজির ক্ষেত।
আবদুল রহিমের অভাবি সংসারে রয়েছে ১ ছেলে ও ৩ মেয়ে।পরিবারের বড় ছেলে পড়েন কলেজে।পড়াশোনা পাশাপাশি বাবার সাথে সময় কাটান পোলট্রি মুরগি খামারে।
দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ বন্যহাতির পাল দিনের বেলায় দেয়াং পাহাড়ের কোরিয়ার ইপিজেডের লেগের পানি থাকে আর খাবারের সন্ধানে সন্ধ্যায় নেমে পড়ে লোকালয়ে।লোকালয়ে কৃষি জমি, মানুষের ঘরবাড়ি, গাছগাছালির তান্ডব চালিয়ে ভাঙচুর করে বিশেষ করে তান্ডবের সময় ক্ষিপ্ত হয়ে মানুষ সামনে পেলে বন্যহাতির পা এবং নিজেদের শুঁড় দিয়ে পিষে মেরে ফেলতেছে অনেক নিরীহ মানুষদের ! আবার কেউ ভাগ্যক্রমে বন্যহাতির পালের আক্রমণ থেকে রক্ষা পেলে বেঁচে থাকে পুঙ্গ হয়ে।এরকম অনেক উদাহরণ রয়েছে তারমধ্যে অন্যতম হলো আবদুল রহিম।
আবদুল রহিমের বাড়ি চট্টগ্রামে আনোয়ারা উপজেলার ১নং বৈরাগ ইউনিয়নের ৫ নং ওয়ার্ডের গুয়াপঞ্চক গ্রামের চামবিবি বাপের বাড়ির মৃত আবদুল আজিজের ছেলে।তিনি রাতে বেলায় দেয়াঙ পাহাড় সংলগ্ন এলাকায় নিজের মুরগি পোলট্রি খামারে থাকেন। প্রতিদিন সকাল দুপুর সন্ধ্যা আর রাতে ব্যস্ত সময় পার করেন মুরগি বাচ্চা গুলো পরিচর্যা এবং দেখা শুনার কাজে।সন্ধ্যা হলে বাড়িতে এসে রাতের খাবার খেয়ে আবার চলে যায় মুরগি ফ্রামে।
বন্যহাতির আক্রমণের শিকার রহিমের ছেলে কায়ছার জানান- আমার আব্বু প্রতিদিন সন্ধ্যায় বা রাত ৮ টার দিকে মুরগি ফ্রাম দেখাশোনা শেষ করে বাড়িতে এসে রাতের খাবার খেয়ে ১০ টার দিকে আবার মুরগি ফ্রামে চলে যায়।রাতে ফ্রামের মুরগি বাচ্চা পরিচর্যা ও পাহারা দিয়ে থাকে।গত ২৩শে অক্টোবর রাতে ১০টা বেজে গেলেও আব্বু বাসা আসেনি। এদিকে এলাকার মসজিদের মাইকিং করা হয়েছে দেয়াঙ পাহাড় থেকে বন্যহাতি নেমেছে সবাই সর্তক থাকুন। সাবধানে চলাফেরা করুন।এলাকায় লোকজন নিয়ে আব্বুকে খোঁজতে রাতে দেয়াঙ পাহাড় সংলগ্ন স্থানে গিয়ে আব্বু বলে ডাকদিলে একটা ভৌতের কণ্ঠে মতো জঙ্গল থেকে একটা শব্দ বাহির হচ্ছিল। আমরা সবাই খুব ভয় পেয়েছিলাম। তবু আমি আবার আব্বু বলে ডাক দিলাম তখন জঙ্গল থেকে শব্দ ভেসে আরছে কায়ছার আব্বু আমি পাহাড়ের ওপর আছি।হাতি আমাকে মেরে শেষ করে দিয়েছে আব্বু আমারে বাঁচা।তখন সবাই মিলে করব স্থান পাশে পাহাড় থেকে আব্বুকে উদ্ধার করে ব্যাটারি চালিত রিক্সা নিয়ে চাতরী চৌমুহনী বাজারে এসে একটা সিএনজি (অটোরিকশা) নিয়ে কর্ণফুলীর উপজেলার শিকলবাহায় কলেজ বাজার থেকে অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছি।চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া সময় আব্বু কিছুক্ষণ পর পর পানি পানি আর ও বাপরে ও বাপরে (বাবারে বাবারে) বলে চিৎকার দিতে লাগলো। বন্যহাতির আক্রমণ আব্বু পেট থেকে নাড়িভুড়ি বাহির হয়ে গেয়েছিল। হাসপাতালে বিভিন্ন পরীক্ষা করার পর ধরা পড়লো আব্বু বুকের ৫ টা হাড় সম্পন্ন ভেঙে গেছে। কোমরে, পা এবং পেটে মারাত্মক ভাবে আঘাত পেয়েছে।
বন্যহাতির তান্ডবের শিকার আবদুল রহিম জানান- ২৩ শে অক্টোবর আমি মুরগি পোলট্রি ফ্রামের খাবার দিয়ে দেখাশোনা শেষ করে বাড়িতে ফিরছিলাম রাতের খাবার খাওয়ার জন্য। রাত ৮ টার মতো হবে আমি তখন জো-পুকুরের পাড়ে আসছি আমার হাতে ছোট একটা টর্চ লাইট ছিল এমন সময় দেখি একটা বন্যহাতি আমার দিকে দৌড়ে আসতেছে।আমার বুঝতে বাকি ছিল না হাতি তাড়া করেছে আমি জীবন বাঁচাতে দৌড়াতে রাখলাম।কিছু দূর যাওয়ার পর দেখি বন্যহাতির শুঁড় দিয়ে ফিছন দিক থেকে আমার বুকের আঘাত করছে।আমি মাটিতে পড়ে গিয়েছিলাম।আমি মাটি থেকে ওঠে কবর স্থানে পাশে পাহাড়ে ওঠতে ছিলাম।এমন সময় হাতি আমাকে শুঁড় দিয়ে টেনে মাটিতে নিয়ে এসে পা দিয়ে আমার পেটের ওপর পিষ্ট করে আমার পেট থেকে নাড়িভুড়ি বাহির করে পেলছে।আমার পাশে তখন একটা মাটি দলা দেখতে পাই। আমি মনে মনে ভাবতেছি আজকে বাঁচলে বাঁচবো না মরবো।তবু শেষ লড়াইটা করে যাবো।আমি মাটির দলাটা দিয়ে বন্যহাতির মাথা ওপর মেরে দিয়েছি।তখন বন্যহাতি ভয়ংকর ভাবে চিৎকার দিলো ততোক্ষণে আমি গায়ে জোরে দিয়ে চেষ্টা করে পাহাড়ের ওপর ওঠে গেছি।আমি যে পাহাড়ের ঢালে ওঠতেছি তা হাতি বুঝতে পারেনি। ১০ মিনিট পড়ে বন্যহাতি আমি মাটিতে শুয়ে আছি মনে করে চারপাশে পায়ের চাপ দিতে লাগলো আমি ওপর থেকে সবকিছু দেখতেছি।ভয়ে আমার সারা শরীর কাঁপতে শুরু করলো এদিকে পেটের নাড়িভুড়ি বাহির হওয়া আর বুকের ৫ টা হাড় ভেঙে গিয়েছে খুব ব্যাথা করছিল।তখন রাত সারে ৮ টা হবে।এমন জায়গায় আটকে আছি নামতে পারতেছিনা।নিচে বন্যহাতি আমাকে খুঁজতে। এমন জায়গা আটকা কোন ডাক দেওয়ার মতো একটা লোকেও দেখতে পারছিনা।হঠাৎ দেখি বন্যহাতি কোথায় চলে গেছে! আমার মনে হয় ১০/১৫ মিনিটের মতো হবে। আবার বন্যহাতি আমাকে খোঁজার জন্য আমার যে জায়গায় আক্রমণ করে ছিল।সেই জায়গার চারিদিকে থাকাচ্ছে আমাকে না পেয়ে একটা চিৎকার দিয়ে চলে গেলো।আমার শরীর বিভিন্ন স্থানে ক্ষত দেখা দিয়েছে অবিরাম রক্ত বাহির হচ্ছে আমার সারা শরীর ক্লান্ত হয়ে গেছে।পাহাড় থেকে নামতে পারছিনা শরীর সেই শক্তি টুকু আমার শরীরে নেই।
রাত ১০টার মতো হবে। তখন দেখি কয়েকজন লোক পাহাড়ের দিকে আসতেছে।তারা যে আমাকে খোঁজতে আসছে আমি জানি না। আমার নাম ধরে রহিম বলে একটা ডাক দিয়ে ছিল তখন আমি একটা শব্দ করতেছি।তখন আমার ছেলে কায়ছার আব্বু বলে ডাক দিয়ে ছিল।আল্লাহ মনে হয় আমাকে গায়েবি কোন শক্তি দান করছে আমি ভাঙা কণ্ঠে একটা ডাক দিলাম আমি পাহারের ওপরে আছি।তখন লোকজন নিয়ে আমাকে পাহাড় থেকে উদ্ধার করে নিচে নামিয়ে আনছে।আমার বার বার মনে হচ্ছিল আমি মনে হয় আর বাঁচবো না। শেষ বারের মতো আমার ছেলে কায়ছারকে কাছে পেয়েছি।















