ঢাকা ১০:৩১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৭ অগাস্ট ২০২৬, ১২ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
সমাজে মানবিকতার সংকট: আমরা কি সত্যিই ভালো মানুষ হতে পারছি? নবগঠিত ঈশ্বরদী উপজেলা ও পৌর বিএনপির নেতৃবৃন্দদের ফুলেল শুভেচ্ছা জানালেন নেতাকর্মীরা ঈশ্বরদী উপজেলা ও পৌর বিএনপির নবগঠিত কমিটিকে স্বাগত জানিয়ে আনন্দ মিছিল নতুন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রীকে সমমনা সংগঠনগুলোর অভিনন্দন ঈশ্বরদী উপজেলা ও পৌর বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি অনুমোদন সন্ত্রাসী-মাদক ব্যবসায়ীদের দ্রুত নির্মূলের নির্দেশ সাংবাদিক সমিতির কুমিল্লা জেলা শাখার প্রচার সম্পাদক হলেন নাগরিক টেলিভিশনের রুবেল মজুমদার ছবির ফ্রেমে ধরে রাখা জীবনের গল্প-আম্বিয়া বেগম অন্তরা চাহিদার কারণে সামনের দিনগুলোতে সারা বিশ্বেই আরও বেশি জ্বালানির প্রয়োজন. ড. মো. আখতার হোসেন সাতকানিয়ায় প্রধানমন্ত্রী গোল্ডকাপ ও নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস আয়োজন নিয়ে মতবিনিময়

বন্ধ পাবনা চিনিকলের ৬০ একর জমিতে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা : সময়ের দাবি ও ভবিষ্যতের বিনিয়োগ

হাবিবুর রহমান হাবিব:
  • আপডেট সময় : ০৩:২৪:৩৯ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬ ১১৮ বার পড়া হয়েছে

বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ। শিল্পায়ন ও নগরায়ণের অগ্রযাত্রার মধ্যেও কৃষিই দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, গ্রামীণ অর্থনীতির বিকাশ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং রপ্তানি আয়ে কৃষির অবদান এখনও অপরিসীম। অথচ কৃষির এই বিশাল সম্ভাবনাকে আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে গবেষণা, উদ্ভাবন এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির ক্ষেত্রে এখনও উল্লেখযোগ্য ঘাটতি রয়েছে। ঠিক এই প্রেক্ষাপটে দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা পাবনা চিনিকলের প্রায় ৬০ একর জমিতে একটি আধুনিক কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব অত্যন্ত যৌক্তিক ও সময়োপযোগী।

একসময় পাবনা চিনিকল ছিল এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রাণকেন্দ্র। হাজারো শ্রমিক-কর্মচারীর কর্মসংস্থান, আখচাষিদের উৎপাদিত ফসলের বাজার এবং স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যের একটি বড় অংশ এই মিলকে ঘিরেই গড়ে উঠেছিল। কিন্তু ব্যবস্থাপনা সংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, যন্ত্রপাতির পুরোনো হয়ে যাওয়া এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাবে মিলটি ক্রমেই লোকসানের বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। একপর্যায়ে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায় এবং একটি সম্ভাবনাময় শিল্প প্রতিষ্ঠান পরিত্যক্ত স্থাপনায় পরিণত হয়।

বর্তমানে চিনিকলের অধিকাংশ জমি ও স্থাপনা কার্যত অব্যবহৃত। দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় মূল্যবান যন্ত্রপাতি নষ্ট হচ্ছে, ভবনগুলো জীর্ণ হয়ে পড়ছে এবং রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ কোনো উৎপাদনশীল কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে না। একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য এ ধরনের অপচয় মোটেও কাম্য নয়। তাই এখন সময় এসেছে এই সম্পদের সর্বোত্তম ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহার নিশ্চিত করার।

প্রশ্ন হচ্ছে, এই বিশাল জমিতে কী করা যেতে পারে? শিল্পাঞ্চল, আবাসন প্রকল্প কিংবা বাণিজ্যিক স্থাপনার মতো বিভিন্ন প্রস্তাব আসতে পারে। কিন্তু জাতীয় স্বার্থ, আঞ্চলিক উন্নয়ন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথা বিবেচনা করলে একটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাই হতে পারে সবচেয়ে দূরদর্শী সিদ্ধান্ত।

পাবনা ও এর আশপাশের অঞ্চল বাংলাদেশের অন্যতম কৃষিসমৃদ্ধ এলাকা। এখানে ধান, আখ, পাট, গম, ভুট্টা, ডাল, তেলবীজ, ফলমূল ও বিভিন্ন ধরনের সবজির ব্যাপক উৎপাদন হয়। পাশাপাশি ঈশ্বরদী অঞ্চলে কৃষি গবেষণা, বীজ উৎপাদন এবং কৃষি সম্প্রসারণ কার্যক্রমের দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। বাংলাদেশ ইক্ষু গবেষণা ইনস্টিটিউটসহ বিভিন্ন কৃষিভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের উপস্থিতি এই অঞ্চলের কৃষি সম্ভাবনাকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। ফলে একটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য এ অঞ্চল স্বাভাবিকভাবেই আদর্শ স্থান।

একটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় শুধু উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠান নয়; এটি গবেষণা, উদ্ভাবন ও প্রযুক্তি উন্নয়নের কেন্দ্র। এখান থেকে উদ্ভাবিত নতুন ফসলের জাত, আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি, সেচ ব্যবস্থাপনা, রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি এবং কৃষি যান্ত্রিকীকরণের বিভিন্ন মডেল সরাসরি কৃষকদের উপকারে আসবে। গবেষণার ফল মাঠপর্যায়ে পৌঁছাবে, কৃষকরা আধুনিক প্রশিক্ষণ পাবেন এবং কৃষি উৎপাদন আরও লাভজনক ও টেকসই হবে।

বর্তমানে দেশের বহু শিক্ষার্থী কৃষি বিষয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণে আসন সংকটের মুখোমুখি হন। পাবনায় একটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলের হাজার হাজার শিক্ষার্থী নিজ অঞ্চলে মানসম্মত কৃষি শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পাবেন। এতে শিক্ষা বিস্তারের পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতিও নতুন গতি পাবে।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ফলে আবাসন, পরিবহন, হোটেল-রেস্তোরাঁ, তথ্যপ্রযুক্তি সেবা, প্রকাশনা ও ক্ষুদ্র ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটবে। শিক্ষক, গবেষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী এবং শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিতে পুরো এলাকায় নতুন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সৃষ্টি হবে। অর্থাৎ একটি বন্ধ শিল্প প্রতিষ্ঠান যেখানে বর্তমানে কোনো অর্থনৈতিক অবদান রাখতে পারছে না, সেখানে একটি বিশ্ববিদ্যালয় দীর্ঘমেয়াদে জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তুলবে।

জলবায়ু পরিবর্তন, খাদ্য নিরাপত্তা এবং কৃষির আধুনিকায়নের মতো বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কৃষি গবেষণার গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে। খরা, বন্যা, লবণাক্ততা ও রোগবালাই সহনশীল ফসল উদ্ভাবন এখন সময়ের দাবি। একটি আধুনিক কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এসব ক্ষেত্রে জাতীয় পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে। বিশেষ করে কৃষিপ্রধান পাবনায় প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয় বাস্তবমুখী গবেষণার মাধ্যমে কৃষকদের সমস্যার কার্যকর সমাধান দিতে সক্ষম হবে।

তবে এই উদ্যোগ বাস্তবায়নের আগে সরকারকে একটি পূর্ণাঙ্গ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা পরিচালনা করতে হবে। চিনিকলের ব্যবহারযোগ্য যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম দেশের সচল চিনিকলগুলোতে স্থানান্তর করা যেতে পারে। অবশিষ্ট জমি শিক্ষা ও গবেষণার কাজে ব্যবহারের লক্ষ্যে পরিবেশগত, অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব মূল্যায়ন করে একটি দীর্ঘমেয়াদি মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করা জরুরি।

একটি জাতির উন্নয়ন শুধু শিল্পকারখানা দিয়ে হয় না; জ্ঞান, গবেষণা এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের মাধ্যমেও হয়। বন্ধ পাবনা চিনিকলের ৬০ একর জমিতে একটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হলে তা হবে একটি মৃতপ্রায় শিল্প এলাকা থেকে জ্ঞান, গবেষণা ও উদ্ভাবনের প্রাণকেন্দ্রে রূপান্তরের অনন্য উদাহরণ। এটি শুধু পাবনা বা ঈশ্বরদীর জন্য নয়, সমগ্র উত্তরাঞ্চলের কৃষি, শিক্ষা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।

তাই সরকারের উচিত স্বল্পমেয়াদি লাভ-ক্ষতির হিসাবের বাইরে গিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া। কারণ একটি বিশ্ববিদ্যালয় শুধু কয়েকটি ভবন নির্মাণের নাম নয়; এটি একটি অঞ্চলের ভবিষ্যৎ নির্মাণের নাম। আর বন্ধ পাবনা চিনিকলের জমিতে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা সেই ভবিষ্যৎ নির্মাণেরই একটি দূরদর্শী ও যুগান্তকারী পদক্ষেপ হতে পারে।

লেখক: হাবিবুর রহমান, সংবাদকর্মী।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :

বন্ধ পাবনা চিনিকলের ৬০ একর জমিতে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা : সময়ের দাবি ও ভবিষ্যতের বিনিয়োগ

আপডেট সময় : ০৩:২৪:৩৯ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬

বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ। শিল্পায়ন ও নগরায়ণের অগ্রযাত্রার মধ্যেও কৃষিই দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, গ্রামীণ অর্থনীতির বিকাশ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং রপ্তানি আয়ে কৃষির অবদান এখনও অপরিসীম। অথচ কৃষির এই বিশাল সম্ভাবনাকে আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে গবেষণা, উদ্ভাবন এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির ক্ষেত্রে এখনও উল্লেখযোগ্য ঘাটতি রয়েছে। ঠিক এই প্রেক্ষাপটে দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা পাবনা চিনিকলের প্রায় ৬০ একর জমিতে একটি আধুনিক কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব অত্যন্ত যৌক্তিক ও সময়োপযোগী।

একসময় পাবনা চিনিকল ছিল এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রাণকেন্দ্র। হাজারো শ্রমিক-কর্মচারীর কর্মসংস্থান, আখচাষিদের উৎপাদিত ফসলের বাজার এবং স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যের একটি বড় অংশ এই মিলকে ঘিরেই গড়ে উঠেছিল। কিন্তু ব্যবস্থাপনা সংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, যন্ত্রপাতির পুরোনো হয়ে যাওয়া এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাবে মিলটি ক্রমেই লোকসানের বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। একপর্যায়ে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায় এবং একটি সম্ভাবনাময় শিল্প প্রতিষ্ঠান পরিত্যক্ত স্থাপনায় পরিণত হয়।

বর্তমানে চিনিকলের অধিকাংশ জমি ও স্থাপনা কার্যত অব্যবহৃত। দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় মূল্যবান যন্ত্রপাতি নষ্ট হচ্ছে, ভবনগুলো জীর্ণ হয়ে পড়ছে এবং রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ কোনো উৎপাদনশীল কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে না। একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য এ ধরনের অপচয় মোটেও কাম্য নয়। তাই এখন সময় এসেছে এই সম্পদের সর্বোত্তম ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহার নিশ্চিত করার।

প্রশ্ন হচ্ছে, এই বিশাল জমিতে কী করা যেতে পারে? শিল্পাঞ্চল, আবাসন প্রকল্প কিংবা বাণিজ্যিক স্থাপনার মতো বিভিন্ন প্রস্তাব আসতে পারে। কিন্তু জাতীয় স্বার্থ, আঞ্চলিক উন্নয়ন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথা বিবেচনা করলে একটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাই হতে পারে সবচেয়ে দূরদর্শী সিদ্ধান্ত।

পাবনা ও এর আশপাশের অঞ্চল বাংলাদেশের অন্যতম কৃষিসমৃদ্ধ এলাকা। এখানে ধান, আখ, পাট, গম, ভুট্টা, ডাল, তেলবীজ, ফলমূল ও বিভিন্ন ধরনের সবজির ব্যাপক উৎপাদন হয়। পাশাপাশি ঈশ্বরদী অঞ্চলে কৃষি গবেষণা, বীজ উৎপাদন এবং কৃষি সম্প্রসারণ কার্যক্রমের দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। বাংলাদেশ ইক্ষু গবেষণা ইনস্টিটিউটসহ বিভিন্ন কৃষিভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের উপস্থিতি এই অঞ্চলের কৃষি সম্ভাবনাকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। ফলে একটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য এ অঞ্চল স্বাভাবিকভাবেই আদর্শ স্থান।

একটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় শুধু উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠান নয়; এটি গবেষণা, উদ্ভাবন ও প্রযুক্তি উন্নয়নের কেন্দ্র। এখান থেকে উদ্ভাবিত নতুন ফসলের জাত, আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি, সেচ ব্যবস্থাপনা, রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি এবং কৃষি যান্ত্রিকীকরণের বিভিন্ন মডেল সরাসরি কৃষকদের উপকারে আসবে। গবেষণার ফল মাঠপর্যায়ে পৌঁছাবে, কৃষকরা আধুনিক প্রশিক্ষণ পাবেন এবং কৃষি উৎপাদন আরও লাভজনক ও টেকসই হবে।

বর্তমানে দেশের বহু শিক্ষার্থী কৃষি বিষয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণে আসন সংকটের মুখোমুখি হন। পাবনায় একটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলের হাজার হাজার শিক্ষার্থী নিজ অঞ্চলে মানসম্মত কৃষি শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পাবেন। এতে শিক্ষা বিস্তারের পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতিও নতুন গতি পাবে।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ফলে আবাসন, পরিবহন, হোটেল-রেস্তোরাঁ, তথ্যপ্রযুক্তি সেবা, প্রকাশনা ও ক্ষুদ্র ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটবে। শিক্ষক, গবেষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী এবং শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিতে পুরো এলাকায় নতুন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সৃষ্টি হবে। অর্থাৎ একটি বন্ধ শিল্প প্রতিষ্ঠান যেখানে বর্তমানে কোনো অর্থনৈতিক অবদান রাখতে পারছে না, সেখানে একটি বিশ্ববিদ্যালয় দীর্ঘমেয়াদে জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তুলবে।

জলবায়ু পরিবর্তন, খাদ্য নিরাপত্তা এবং কৃষির আধুনিকায়নের মতো বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কৃষি গবেষণার গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে। খরা, বন্যা, লবণাক্ততা ও রোগবালাই সহনশীল ফসল উদ্ভাবন এখন সময়ের দাবি। একটি আধুনিক কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এসব ক্ষেত্রে জাতীয় পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে। বিশেষ করে কৃষিপ্রধান পাবনায় প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয় বাস্তবমুখী গবেষণার মাধ্যমে কৃষকদের সমস্যার কার্যকর সমাধান দিতে সক্ষম হবে।

তবে এই উদ্যোগ বাস্তবায়নের আগে সরকারকে একটি পূর্ণাঙ্গ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা পরিচালনা করতে হবে। চিনিকলের ব্যবহারযোগ্য যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম দেশের সচল চিনিকলগুলোতে স্থানান্তর করা যেতে পারে। অবশিষ্ট জমি শিক্ষা ও গবেষণার কাজে ব্যবহারের লক্ষ্যে পরিবেশগত, অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব মূল্যায়ন করে একটি দীর্ঘমেয়াদি মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করা জরুরি।

একটি জাতির উন্নয়ন শুধু শিল্পকারখানা দিয়ে হয় না; জ্ঞান, গবেষণা এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের মাধ্যমেও হয়। বন্ধ পাবনা চিনিকলের ৬০ একর জমিতে একটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হলে তা হবে একটি মৃতপ্রায় শিল্প এলাকা থেকে জ্ঞান, গবেষণা ও উদ্ভাবনের প্রাণকেন্দ্রে রূপান্তরের অনন্য উদাহরণ। এটি শুধু পাবনা বা ঈশ্বরদীর জন্য নয়, সমগ্র উত্তরাঞ্চলের কৃষি, শিক্ষা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।

তাই সরকারের উচিত স্বল্পমেয়াদি লাভ-ক্ষতির হিসাবের বাইরে গিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া। কারণ একটি বিশ্ববিদ্যালয় শুধু কয়েকটি ভবন নির্মাণের নাম নয়; এটি একটি অঞ্চলের ভবিষ্যৎ নির্মাণের নাম। আর বন্ধ পাবনা চিনিকলের জমিতে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা সেই ভবিষ্যৎ নির্মাণেরই একটি দূরদর্শী ও যুগান্তকারী পদক্ষেপ হতে পারে।

লেখক: হাবিবুর রহমান, সংবাদকর্মী।