ঢাকা ০২:৫৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ১৫ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা হাবিবুর রহমান হাবিবের বিরুদ্ধে অপপ্রচারের প্রতিবাদে মানববন্ধন ঈশ্বরদীর পদ্মাপাড়ে সন্ত্রাসের আতঙ্ক, নিরাপত্তার দাবিতে মানববন্ধন বিএনপিকে ক্ষমতাচ্যুত করার ষড়যন্ত্রকারীদের রাজনীতি চিরতরে কবর দেওয়া হবে: হাবিবুর রহমান ঈশ্বরদীতে বসতবাড়ি দখল করে সীমানা প্রাচীর ও গেট নির্মাণ: হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ ঈশ্বরদীতে পোল্ট্রি খামারে বিদ্যুৎ স্পৃষ্টে যুবকের মৃত্যু ঈশ্বরদীতে সড়কের কাজের মান যাচাইয়ে মাঠে এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী সরকারি সফরের নামে স্ত্রী নিয়ে সচিবের ভ্রমণ কুমিল্লায় ১০ কেজি গাঁজাসহ গ্রেপ্তার ২  ঠাকুরগাঁওয়ে হিফজুল কুরআন ও হুসনে সওত প্রতিযোগিতা ও পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠিত ফরিদপুরে দ্বিতীয় শ্রেণীর শিক্ষার্থীকে ধর্ষণ চেষ্টা: সপ্তাহ পেরোলেও ধরাছোঁয়ার বাহিরে আসামি রুবেল

সোনাই নদী লুটের মহোৎসব: হুমকিতে ২৬ কোটি টাকার রাবার ড্যাম, ঝুঁকিতে স্বপ্নের সেতু

মোঃ আব্দুর রব : নিজস্ব প্রতিনিধি সিলেট
  • আপডেট সময় : ০৬:৪৩:১২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬ ১০০ বার পড়া হয়েছে

সিলেট বিভাগের সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার ইসলামপুর ইউনিয়নের সোনাই নদীতে দীর্ঘদিন ধরে চলা অবৈধ বালু উত্তোলন এখন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।

বালুখেকোদের লাগামহীন তৎপরতায় প্রায় ২৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সরকারি রাবার ড্যাম প্রকল্প হুমকির মুখে পড়েছে।

একই সঙ্গে স্থানীয়দের অর্থায়নে নির্মিত ‘স্বপ্নের অগ্রযাত্রা’ নামের স্টিল সেতুসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোও ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

নদীভাঙন বৃদ্ধি, তীররক্ষা বাঁধের ক্ষয় এবং সরকারি সম্পদ ধ্বংসের ঘটনায় উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে পুরো এলাকায়।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১০ সালে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি)-এর অর্থায়নে প্রায় ২৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত রাবার ড্যাম প্রকল্পটি বর্তমানে অবৈধ বালু উত্তোলনের কারণে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে রয়েছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, রাবার ড্যাম বাজার, বাহাদুরপুর ও বৈশাকান্দি এলাকার বিভিন্ন অংশে নদীভাঙনের আশঙ্কা বেড়েছে।

নদীর দুই তীরে ফসল রক্ষা বাঁধে স্থাপিত কংক্রিট ব্লক ধসে পড়ছে এবং তীররক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ছে।

এদিকে স্থানীয় জনসাধারণের অর্থায়নে সম্প্রতি নির্মিত ২৬০ ফুট দৈর্ঘ্যের ‘স্বপ্নের অগ্রযাত্রা’ স্টিল সেতুটিও হুমকির মুখে রয়েছে।

নদীর তলদেশ থেকে নির্বিচারে বালু উত্তোলনের ফলে সেতুর পিলার ও সংযোগ সড়কের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ার আশঙ্কা করছেন এলাকাবাসী।

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকাশ্যে দিনের বেলা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত অবৈধভাবে বালু উত্তোলন চললেও প্রশাসনের দৃশ্যমান কোনো কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বৈধ লিজ না থাকা সত্ত্বেও বালুবাহী প্রতিটি নৌকা থেকে ‘রয়্যালটি’র নামে প্রতি ঘনফুট বালুর বিপরীতে ১৩ টাকা করে আদায় করা হচ্ছে।

একটি নৌকায় গড়ে প্রায় ৮০০ ঘনফুট বালু বহন করা হয়। সে হিসাবে প্রতিটি নৌকা থেকে প্রায় ১০ হাজার ৪০০ টাকা আদায় করা হচ্ছে।

প্রতিদিন শতাধিক নৌকায় বালু পরিবহন হওয়ায় এ খাতে দৈনিক লাখ লাখ টাকার অবৈধ বাণিজ্য গড়ে উঠেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

পুলিশের একটি উচ্চপর্যায়ের সূত্র জানিয়েছে, সোনাই নদী ও আশপাশের এলাকায় অবৈধ বালু উত্তোলনকে কেন্দ্র করে এ পর্যন্ত ৫১ থেকে ৫২টি মামলা দায়ের করা হয়েছে।

এসব মামলায় ৩০০ জনেরও বেশি ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। তবে ‘বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন’-এর অধিকাংশ ধারা জামিনযোগ্য হওয়ায় অভিযুক্তরা সহজেই জামিন পেয়ে পুনরায় একই কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, আমরা ৩০০ জনের বেশি আসামিকে আইনের আওতায় আনলেও আইনি সীমাবদ্ধতার কারণে তাদের কেউই কার্যকর শাস্তির মুখোমুখি হয়নি।

আদালত থেকে জামিন পেয়ে আবারও অবৈধ বালু উত্তোলনে জড়িয়ে পড়ছে।

তিনি আরও বলেন, সাধারণ মামলা দিয়ে এ অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। উপজেলা প্রশাসনের নেতৃত্বে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা এবং তাৎক্ষণিক শাস্তির ব্যবস্থা করা গেলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।

স্থানীয় চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী কামরুল ইসলাম অভিযোগ করে বলেন, -সেতুটি হুমকির মুখে পড়ার বিষয়টি একাধিকবার প্রশাসনকে জানানো হয়েছে।

কিন্তু এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি।

এ বিষয়ে ছাতক উপজেলা ভূমি অফিসের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বলেন,- বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। তদন্ত করে অবৈধ বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সুনামগঞ্জ জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. মোহাইমিনুল হক বলেন, “অবৈধভাবে নদী থেকে বালু উত্তোলনের কোনো সুযোগ নেই। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

সুনামগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার এ বি এম জাকির হোসেন পিপিএম বলেন, -অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে জেলা পুলিশের অবস্থান জিরো টলারেন্স।

জেলা ও উপজেলা প্রশাসন যখনই মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে, পুলিশ সর্বাত্মক সহযোগিতা প্রদান করে।

এলাকাবাসীর দাবি, অবৈধ বালু উত্তোলন অবিলম্বে বন্ধ করে সোনাই নদী, রাবার ড্যাম, তীররক্ষা বাঁধ এবং স্থানীয়দের স্বপ্নের সেতু রক্ষায় জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হোক।

অন্যথায় কোটি টাকার সরকারি সম্পদ ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো যে কোনো সময় বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :

সোনাই নদী লুটের মহোৎসব: হুমকিতে ২৬ কোটি টাকার রাবার ড্যাম, ঝুঁকিতে স্বপ্নের সেতু

আপডেট সময় : ০৬:৪৩:১২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬

সিলেট বিভাগের সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার ইসলামপুর ইউনিয়নের সোনাই নদীতে দীর্ঘদিন ধরে চলা অবৈধ বালু উত্তোলন এখন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।

বালুখেকোদের লাগামহীন তৎপরতায় প্রায় ২৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সরকারি রাবার ড্যাম প্রকল্প হুমকির মুখে পড়েছে।

একই সঙ্গে স্থানীয়দের অর্থায়নে নির্মিত ‘স্বপ্নের অগ্রযাত্রা’ নামের স্টিল সেতুসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোও ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

নদীভাঙন বৃদ্ধি, তীররক্ষা বাঁধের ক্ষয় এবং সরকারি সম্পদ ধ্বংসের ঘটনায় উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে পুরো এলাকায়।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১০ সালে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি)-এর অর্থায়নে প্রায় ২৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত রাবার ড্যাম প্রকল্পটি বর্তমানে অবৈধ বালু উত্তোলনের কারণে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে রয়েছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, রাবার ড্যাম বাজার, বাহাদুরপুর ও বৈশাকান্দি এলাকার বিভিন্ন অংশে নদীভাঙনের আশঙ্কা বেড়েছে।

নদীর দুই তীরে ফসল রক্ষা বাঁধে স্থাপিত কংক্রিট ব্লক ধসে পড়ছে এবং তীররক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ছে।

এদিকে স্থানীয় জনসাধারণের অর্থায়নে সম্প্রতি নির্মিত ২৬০ ফুট দৈর্ঘ্যের ‘স্বপ্নের অগ্রযাত্রা’ স্টিল সেতুটিও হুমকির মুখে রয়েছে।

নদীর তলদেশ থেকে নির্বিচারে বালু উত্তোলনের ফলে সেতুর পিলার ও সংযোগ সড়কের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ার আশঙ্কা করছেন এলাকাবাসী।

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকাশ্যে দিনের বেলা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত অবৈধভাবে বালু উত্তোলন চললেও প্রশাসনের দৃশ্যমান কোনো কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বৈধ লিজ না থাকা সত্ত্বেও বালুবাহী প্রতিটি নৌকা থেকে ‘রয়্যালটি’র নামে প্রতি ঘনফুট বালুর বিপরীতে ১৩ টাকা করে আদায় করা হচ্ছে।

একটি নৌকায় গড়ে প্রায় ৮০০ ঘনফুট বালু বহন করা হয়। সে হিসাবে প্রতিটি নৌকা থেকে প্রায় ১০ হাজার ৪০০ টাকা আদায় করা হচ্ছে।

প্রতিদিন শতাধিক নৌকায় বালু পরিবহন হওয়ায় এ খাতে দৈনিক লাখ লাখ টাকার অবৈধ বাণিজ্য গড়ে উঠেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

পুলিশের একটি উচ্চপর্যায়ের সূত্র জানিয়েছে, সোনাই নদী ও আশপাশের এলাকায় অবৈধ বালু উত্তোলনকে কেন্দ্র করে এ পর্যন্ত ৫১ থেকে ৫২টি মামলা দায়ের করা হয়েছে।

এসব মামলায় ৩০০ জনেরও বেশি ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। তবে ‘বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন’-এর অধিকাংশ ধারা জামিনযোগ্য হওয়ায় অভিযুক্তরা সহজেই জামিন পেয়ে পুনরায় একই কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, আমরা ৩০০ জনের বেশি আসামিকে আইনের আওতায় আনলেও আইনি সীমাবদ্ধতার কারণে তাদের কেউই কার্যকর শাস্তির মুখোমুখি হয়নি।

আদালত থেকে জামিন পেয়ে আবারও অবৈধ বালু উত্তোলনে জড়িয়ে পড়ছে।

তিনি আরও বলেন, সাধারণ মামলা দিয়ে এ অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। উপজেলা প্রশাসনের নেতৃত্বে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা এবং তাৎক্ষণিক শাস্তির ব্যবস্থা করা গেলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।

স্থানীয় চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী কামরুল ইসলাম অভিযোগ করে বলেন, -সেতুটি হুমকির মুখে পড়ার বিষয়টি একাধিকবার প্রশাসনকে জানানো হয়েছে।

কিন্তু এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি।

এ বিষয়ে ছাতক উপজেলা ভূমি অফিসের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বলেন,- বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। তদন্ত করে অবৈধ বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সুনামগঞ্জ জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. মোহাইমিনুল হক বলেন, “অবৈধভাবে নদী থেকে বালু উত্তোলনের কোনো সুযোগ নেই। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

সুনামগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার এ বি এম জাকির হোসেন পিপিএম বলেন, -অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে জেলা পুলিশের অবস্থান জিরো টলারেন্স।

জেলা ও উপজেলা প্রশাসন যখনই মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে, পুলিশ সর্বাত্মক সহযোগিতা প্রদান করে।

এলাকাবাসীর দাবি, অবৈধ বালু উত্তোলন অবিলম্বে বন্ধ করে সোনাই নদী, রাবার ড্যাম, তীররক্ষা বাঁধ এবং স্থানীয়দের স্বপ্নের সেতু রক্ষায় জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হোক।

অন্যথায় কোটি টাকার সরকারি সম্পদ ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো যে কোনো সময় বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।