১ হাজার ৩৬৫ কোটি টাকা ব্যয়ে পাবনা মানসিক হাসপাতালকে বিশ্বমানের স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট প্রকল্প একনেকে অনুমোদন
- আপডেট সময় : ০৯:৪০:০৯ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ অক্টোবর ২০২৫ ২৭২ বার পড়া হয়েছে
শুধু মানসিক চিকিৎসা প্রদান নয়, স্নাতকোত্তর পর্যায়ে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক পাঠক্রম, ল্যাবরেটরি, গবেষণা ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালু, আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম স্থাপন এবং মানসিক প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য বিদ্যালয় নির্মাণ ও কমিউনিটি নেটওয়ার্ক তৈরির মাধ্যমে মানসিক স্বাস্থ্য ও টেলিমেডিসিন সেবা সম্প্রসারণে পাবনা হেমায়েতপুরে অবস্থিত মানসিক হাসপাতালকে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে রূপান্তরের কার্যক্রম হাতে নিয়েছে সরকার। এক্ষেত্রে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের আওতায় বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পটির সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৩৬৫ কোটি টাকা, যার পুরোটাই সরকারি অর্থায়ন। দেশের উত্তরাঞ্চলের জনপদের জন্য বিশেষায়িত এই হাসপাতাল প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে রাজধানী ও পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোর ওপর চাপ কমবে বলে মনে করা হচ্ছে।
প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, মঙ্গলবার অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় ৩ হাজার ১৯৯ কোটি টাকা ব্যয়ে ১২টি প্রকল্প অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হচ্ছে। এর মধ্যে সরকারি অর্থায়ন ২ হাজার ১৩২ কোটি টাকা, প্রকল্প ঋণ ১ হাজার ১৬ কোটি ৮২ লাখ টাকা এবং সংস্থার নিজস্ব অর্থায়ন ৫০ কোটি টাকা।
উল্লিখিত প্রকল্পটির বিষয়ে প্রকল্প সার-সংক্ষেপে বলা হয়েছে, ১৯৫৭ সালে পাবনার ‘শীতলাই হাউজ’ নামের জমিদার বাড়িতে প্রথমে একটি মানসিক হাসপাতাল অস্থায়ীভাবে স্থাপন করা হয়। পরবর্তীতে ১৯৫৯ সালে জেলা শহর থেকে ৫ কিলোমিটার দূরে হেমায়েতপুর এলাকায় ঠাকুর অনুকূল চন্দ্রের দান করা ১৩২ দশমিক ২৫ একর জমিতে হাসপাতালটি স্থানান্তরিত করা হয়। প্রাথমিকভাবে হাসপাতালটি ৬০ শয্যাবিশিষ্ট হলেও ধাপে ধাপে একে ৫০০ শয্যায় উন্নীত করা হয়। যার মধ্যে ১২০টি শয্যার জন্য ফি প্রদান করতে হয় এবং ২৮০টি সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। এছাড়াও ১০০টি শয্যা রয়েছে প্রকল্পের অধীনে।
হাসপাতালটিতে শুধু মানসিক চিকিৎসাই নয়, রয়েছে মাদকাসক্তি নিরাময় ওয়ার্ড। মোট ১৮টি ওয়ার্ডের মধ্যে পুরুষদের জন্য ১৩টি, যেখানে ১১টি নন-পেয়িং এবং ২টি পেয়িং। অপরদিকে নারীদের জন্য রয়েছে ৫টি ওয়ার্ড, যেখানে ৪টি নন-পেয়িং এবং ১টি পেয়িং।
তবে প্রতিষ্ঠার পর গত প্রায় ৭০ বছরে দেশের জনসংখ্যা ও মানসিক রোগীর সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়লেও সে অনুপাতে হাসপাতালের শয্যা সংখ্যা বাড়েনি। বরং দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনায় ২০০টি শয্যা ব্যবহারের অনুপযুক্ত হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে অভাব রয়েছে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সংবলিত চিকিৎসা ও আবাসন সুবিধা, জনবল এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের। এমন প্রেক্ষাপটে বিদ্যমান হাসপাতালটিকে ১ হাজার শয্যাবিশিষ্ট আন্তর্জাতিক মানের হাসপাতালে রূপান্তরে আধুনিক মানের ওয়ার্ড, রোগী পুনর্বাসন সেন্টার, বৃত্তিমূলক সেন্টার, মিউজিক্যাল থেরাপি, চিত্রাঙ্কন সেন্টার, হাফওয়ে হাউস, চাইল্ড সাইকিয়াট্রি, অটিজম সেন্টার, সার্বক্ষণিক জরুরি বিভাগ, অ্যামিউজমেন্ট সেন্টার, গার্ডেনিং, সুইমিং, ক্যাটল ফার্মিং, সাইকিয়াট্রিক ট্রেনিং সেন্টার, আধুনিক প্যাথলজি বিভাগ, লন্ড্রি প্ল্যান্ট, আধুনিক স্টোর ভবন, আধুনিক প্রশাসনিক ভবন, বহির্বিভাগ, যানবাহন সুযোগ-সুবিধা, আধুনিক ডরমিটরি, চিকিৎসক, নার্স, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের আবাসন, সাইকিয়াট্রিক বিশেষজ্ঞ সৃষ্টির জন্য স্নাতকোত্তর কোর্স চালু, প্লে গ্রাউন্ড এবং ওয়াকওয়েসহ বিভিন্ন সুবিধা নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার।
প্রকল্পটির উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলা হয়, নতুন অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে বিদ্যমান হাসপাতালটিকে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে রূপান্তরের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় ভৌত অবকাঠামো পরিবেশ প্রস্তুত করা; ¯œাতকোত্তর পর্যায়ে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক পাঠক্রম চালুর জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, শ্রেণিকক্ষ, ল্যাবরেটরি, পাঠাগার ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা স্থাপন; ভবিষ্যতে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক শিক্ষা, গবেষণা ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালুর জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, সরঞ্জাম ও পরিবেশ তৈরি; হাসপাতালে নতুন ও কার্যকর বিভিন্ন বিভাগ চালু ও আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম স্থাপনের মাধ্যমে মানসিক রোগের চিকিৎসায় আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বহুমুখী সেবা প্রদানের উপযোগী পরিবেশ তৈরি ও জরাজীর্ণ-অনুপযোগী ভবনগুলো অপসারণ করে আধুনিক অবকাঠামো নির্মাণের জন্য জায়গা প্রস্তুত এবং মানসিক স্বাস্থ্য ও টেলিমেডিসিন সেবা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি স্থাপন করাসহ কমিউনিটি নেটওয়ার্ক তৈরি করা ও মানসিক প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য বিদ্যালয় ভবন নির্মাণের মাধ্যমে শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ তৈরি করা।
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে শুরু হয়ে ২০২৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ৩ বছর মেয়াদি এই প্রকল্পের কার্যক্রমে বিভিন্ন লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে ৬ তলা বহির্বিভাগ ও জরুরি বিভাগ ভবন নির্মাণ, ৬ তলাবিশিষ্ট ওয়ার্ড কমপ্লেক্স নির্মাণ, ৬ তলা একাডেমিক ভবন নির্মাণ, ৭ তলাবিশিষ্ট পেশেন্ট এটেনডেন্ট হোস্টেল ভবন নির্মাণ, চিকিৎসক ও হাসপাতাল কর্মীদের আবাসনের জন্য ৮ তলাবিশিষ্ট ৪টি ভবন নির্মাণ, স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষার্থী ও প্রশিক্ষণার্থীদের জন্য ৬ তলাবিশিষ্ট দুটি হোস্টেল (মহিলা ও পুরুষ), ৮ তলাবিশিষ্ট ২টি ডক্টরস ডরমিটরি (পুরুষ) এবং নার্স ডরমিটরি নির্মাণ, ৫ তলাবিশিষ্ট একটি মাল্টি-ফাংশনাল ভবন, মানসিক প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য ৩ তলাবিশিষ্ট ১টি বিদ্যালয় ভবন, ৬ তলাবিশিষ্ট ১টি কেবিন ও সার্ভিস ব্লক ভবন এবং ২তলা বিশিষ্ট ১টি মসজিদ ভবন নির্মাণ।
এক্ষেত্রে অঙ্গভিত্তিক ব্যয়ে দেখানো হয়েছে, আবাসিক ভবন নির্মাণে ব্যয় হবে ৫৩৮ কোটি ৮৩ লাখ টাকা, যেখানে অনাবাসিক ভবন নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ৫০৩ কোটি ১৩ লাখ টাকা। প্রকল্পটিতে বৈদ্যতিক সংযোগ স্থাপনে ব্যয় হবে ১৯৭ কোটি ৩১ লাখ টাকা, মোটরযান (দুটি মাইক্রোবাস, দুটি অ্যাম্বুলেন্স, একটি কোস্টার/মিনি বাস এবং একটি পিকআপ) বাবদ ৩ কোটি ৪২ লাখ টাকা, ২৪৪টি কম্পিউটার ও আনুষঙ্গিক সরঞ্জামের জন্য প্রায় ১ কোটি ৪৭ লাখ টাকা, কম্পিউটার সফটওয়্যার (অটোমেশন) বাবদ ৪ কোটি ৩০ লাখ টাকা, টেলিযোগাযোগ সরঞ্জামে প্রায় ৯ লাখ টাকা, অফিস সরঞ্জাম (প্রকল্প অফিস, ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল) বাবদ ৯৩ লাখ টাকা, আসবাবপত্র (প্রকল্প অফিস, ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল) বাবত ২৫ কোটি ৩৯ লাখ টাকা, চিকিৎসা যন্ত্রপাতির (ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল) জন্য ৫৯ কোটি ১৯ লাখ টাকা, লন্ড্রি ও কিচেন যন্ত্রপাতির জন্য প্রায় ২ কোটি ৮ লাখ টাকা, সরবরাহ সেবা বাবদ ৩ কোটি ২৪ লাখ টাকা এবং অবকাঠামোগত ও মূল্যগত আকস্মিক পরিস্থিতির জন্য ১ শতাংশ হারে ২৫ কোটি ৭৯ লাখ টাকা।
























